এখন ব্যাংকিংকে ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে আসছেন নারীরা। সফলও হচ্ছেন। নারী দিবস সামনে রেখে ব্যাংক খাতের নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের নারী ব্যাংকিং বিভাগের (তারা) প্রধান মেহরুবা রেজা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফ।

প্রথম আলো: ব্যাংকিং সেবায় নারীদের অংশগ্রহণ এখন কেমন?
মেহরুবা রেজা: ব্র্যাক ব্যাংকের প্রেক্ষাপটে যদি বলি, তাহলে তারা (নারীদের জন্য বিশেষ ব্যাংকিং পণ্য) চালুর আগে আমাদের মোট গ্রাহকের মাত্র ১৩ শতাংশ ছিলেন নারী। এখন সেটা ২৮ শতাংশ। সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছর ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪ শতাংশ। ২০১৭ সালে চালু হওয়া এই সেবা পণ্যের আগামী মে মাসে পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। সময়ের বিবেচনায় নারীদের এই অংশগ্রহণ বেশ উল্লেখযোগ্য বলা যায়।
প্রথম আলো: নারীরা ব্যাংকে হিসাব পরিচালনার পাশাপাশি আর কী ধরনের সেবার জন্য আসছেন?
মেহরুবা রেজা: নারীরা এখন শুধু হিসাব খোলা বা নিয়মিত ব্যাংকিং করতে আসছেন, এমন নয়। তাঁরা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য ঋণ নিতে আসছেন। আগে ব্যাংকে ১০ জন নারী আসলে তার মধ্যে দুজন ঋণের জন্য আসতেন। এখন সেটা ১০ জনে ৫ জন। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে নারীদের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এ ছাড়া নারীরা ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, প্রবাসী আয় সংগ্রহ ও ঋণপত্র খোলার মতো কাজেও ব্যাংকে আসেন। ব্যাংকিংয়ের যত শাখা আছে, প্রায় সব শাখাতেই নারীদের এখন বিচরণ দেখা যাচ্ছে।
প্রথম আলো: ব্যাংক খাতে নারীর অংশগ্রহণ আরও কীভাবে বাড়ানো যায়?
মেহরুবা রেজা: নারীরা এখন যে ব্যাংকে আসছেন, এটা কিন্তু এক দিনে সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আসতে বেশ সময় লেগেছে। এমনকি আমরা যখন ‘তারা প্রোগ্রাম’ শুরু করতে যাই, তখন আমাদের সহকর্মীরাই এই চ্যালেঞ্জ নিতে চাননি। তাঁরা বলেছিলেন, নারীদের বোঝানো কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। নারীরা ব্যাংকিংয়ের মতো আর্থিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পরিবারের অনুমতি ছাড়া তো আসতে চাইবে না, নানা প্রশ্নে জর্জরিত হবেন। কিন্তু আমরা নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস খুঁজেছি। সুতরাং এখানে সমতা বিধান করতে গেলে অবশ্যই নারীর আর্থিক জ্ঞান বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির মতো ব্যাপারে উৎসাহ দিতে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। তাহলে নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রথম আলো: তাহলে নারীদের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানোর উপায় কী হতে পারে?
মেহরুবা রেজা: আমাদের সমাজে আর্থিক বিষয়ে সব সময় বাবা, ভাই বা স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ফলে নারীর মধ্যে এই সক্ষমতা গড়ে ওঠে না। এ অবস্থা নিরসনে ব্যাংকের উদ্যোগে নারীদের জন্য সভা, সেমিনার ও ওয়েবিনার আয়োজন করতে হবে। ধরেন, শেয়ারবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কম। এ বিষয়ে নারীদের আগ্রহী করতে আমরা ওয়েবিনার করেছি। শুধু ব্যাংকিং সেবা দিলেই হবে না, নানা ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আর্থিক বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারীদেরও স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসা উচিত। আমরা এমন একটা সমাজের দিকে এগোতে চাই, যেখানে নারীদের জন্য আলাদা ব্যাংকিং বলে কোনো বিষয় থাকবে না। বরং নারী-পুরুষ সমতার ভিত্তিতে পরিবারের আর্থিক বিষয়ে সমানভাবে অংশগ্রহণ করবেন।
প্রথম আলো: পেশা হিসেবে ব্যাংকিংকে নারীরা কতটা গ্রহণ করছেন। অন্যভাবে যদি বলি তাহলে বর্তমানে ব্যাংকিং পেশাটি কতটা নারীবান্ধব?
মেহরুবা রেজা: আমি যখন এই পেশায় ক্যারিয়ার শুরু করি তখনকার তুলনায় এখন মেয়েরা অনেক বেশি এ পেশায় আসছেন। যেহেতু ব্যাংকের কাজ শেষ করতে অনেক সময় রাত হয়ে যায়। এবং রাত করে বাড়ি ফেরাকে অনেকে ভালো চোখে দেখত না। এ জন্য ব্যাংকের চাকরিতে মেয়েরা কম আসত। এখন দিন বদলে গেছে, রাত আট-নয়টার সময়ও অনেকে কাজ থেকে ফিরছে। এ ছাড়া নতুন নতুন প্রযুক্তি আসার ফলে ব্যাংকিং ক্যারিয়ারও বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। আশার বিষয় হচ্ছে, নারীরা এখন ব্যাংকের বিপণন বিভাগ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি শাখা সবখানে কাজ করছে। চ্যালেঞ্জ নিয়ে পুরুষের মতোই এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে একটা সমস্যা লক্ষণীয়, অনেক সময় নারীরা স্বামী-সন্তানকে সময় দিতে মধ্যম ক্যারিয়ারে এসে পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান জরুরি। এ পেশায় আসলে এটা ভেবে আসতে হবে, একদিন তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহী হবেন।
প্রথম আলো: নারী দিবস সামনে রেখে দেশের সব নারীর প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
মেহরুবা রেজা: নারীদের জন্য বলব, সমতার জোরালো দাবি উত্থাপনের সঙ্গে আর্থিক বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞান রাখতে হবে। তাহলেই আপনার আর্থিক চাওয়াটা পূরণ হওয়া সম্ভব। পাশাপাশি অন্যের ওপর ভর করে অধিকারপ্রাপ্তির আশা না করে নিজ ইচ্ছা শক্তিতে বলীয়ান হতে হবে। নিজে সচেতন না হলে, অধিকারপ্রাপ্তির আশা সমীচীন নয়। আমি মনে করি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নারীর স্বপ্রণোদিত অংশগ্রহণই সমতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সব ক্ষেত্রে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজ যেমন নারীর সুযোগ তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তেমনি নারীদেরও স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।