১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৩৪ কোটি ৮৪ ডলারের পণ্য, যা তখনকার দেশীয় মুদ্রায় ছিল প্রায় ২৭১ কোটি টাকা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। রপ্তানি পণ্য বলতে ভরসা এক পাট, আরেক চামড়া। এই দুটি পণ্যের ওপর ভর করেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার, তখনকার দেশীয় মুদ্রায় যা ছিল ২৭১ কোটি টাকার সমান। মোট রপ্তানিতে পাট ও পাটপণ্যের অবদান ছিল ৮৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর চামড়া খাতের অবদান ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এভাবেই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি।
আশির দশকের গোড়ার দিকে পণ্য রপ্তানিতে যুক্ত হয় তৈরি পোশাক। ধীরে ধীরে খাতটির দাপট বাড়তে থাকে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে পাটকে হটিয়ে শীর্ষ স্থান দখল করে নেয় তৈরি পোশাক। সঙ্গে নিত্যনতুন পণ্য যুক্ত হতে থাকে দেশের রপ্তানি ঝুড়িতে। ফলে পাঁচ দশকের ব্যবধানে রপ্তানি আয় ১১১ গুণ বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকার সমান। এই আয় চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের অর্ধেকের বেশি। যদিও রপ্তানি আয়ের একটি অংশ বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবির) তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের প্রায় ৯৭ শতাংশই এসেছিল পাঁচটি পণ্য থেকে। এর মধ্যে কাঁচা পাটে ১৩ কোটি ডলার, পাটপণ্যে ১৮ কোটি ডলার, চামড়ায় ১ কোটি ৬১ লাখ ডলার, চায়ে ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ডলার, হিমায়িত খাদ্যে ৩০ লাখ ৬১ হাজার ডলার এবং কৃষিপণ্যে ৭ লাখ ১৩ হাজার ডলার অর্জিত হয়েছিল।
তখন তৈরি পোশাক রপ্তানির কোনো নামনিশানা ছিল না। তবে ছয় হাজার ডলারের গেঞ্জি রপ্তানি হয়েছিল। রিয়াজ গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিনের হাত ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয় ১৯৭৮ সালের ২৮ জুলাই। ১০ হাজার শার্ট ফরাসি ক্রেতা হলান্ডার ফ্রঁসের কাছে রপ্তানি করেন তিনি। শার্টের ওই চালানের ফরাসি মুদ্রায় দাম ছিল ১৩ মিলিয়ন ফ্রাঁ, বাংলাদেশি টাকায় যা ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা।
অবশ্য প্রথম শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা গড়েছিলেন দেশ গার্মেন্টসের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ নূরুল কাদের। তাঁদের দেখানো পথ ধরে পরবর্তীকালে রপ্তানি খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য শুরু হয় তৈরি পোশাকশিল্পের। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলারের মোট রপ্তানির মধ্যে পোশাক খাত থেকে এসেছে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ডলার। প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ তৃতীয়।
রপ্তানিতে অনেক অগ্রগতি হলেও কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরতার চক্র থেকে বের হতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমানে মোট রপ্তানিতে পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্যের অবদান ৯০ শতাংশ। সার্বিক রপ্তানিতে শুধু পোশাক খাতের হিস্যাই ৮১ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে পণ্য রপ্তানি মূলত দুই বাজার, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর নির্ভরশীল রয়ে গেছে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার জন্য গত এক দশকে অনেক চেষ্টা হলেও সফলতা আসেনি। আমি মনে করি, হয়তো উদ্যোক্তাদের যথাযথ উদ্যোগের ঘাটতির কারণেই এটি হয়েছে। সফল খাতের দিকেই উদ্যোক্তারা সব সময় ঝাঁপিয়ে পড়েন। পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। উদ্যোক্তাদের চেষ্টায় খাতটি সফল হওয়ার পর সরকার সহায়তা দিয়েছে। তাই উদ্যোক্তাদের বৃত্তের বাইরে চিন্তা করতে হবে। ঝুঁকি নিতে হবে। তাহলেই পরিবর্তন আসবে।’