বিবিএসের সমীক্ষা

প্রবাসী আয়ের চার ভাগের তিন ভাগই যায় ভোগে

প্রবাসী আয় হিসেবে যত টাকা দেশে আসে, এর মাত্র ২৫ শতাংশের কিছু বেশি বিনিয়োগ হয়। সিংহভাগ খরচ হয় ভোগেই। খাবার, যাতায়াত, জামাকাপড়, মুঠোফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজ, আসবাবসহ বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটায় চার ভাগের তিন ভাগ টাকা খরচ করে ফেলেন বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় খরচ করতে হয়। দারিদ্র্যসীমার কিছু ওপরে থাকা বেশির ভাগ পরিবার সংসারের নানা চাহিদা মেটাতেই সব টাকা খরচ করে ফেলে।
প্রবাসী আয় পায় এমন ৯ হাজার ৪৪৮টি পরিবারের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে সম্প্রতি ফলাফল প্রকাশ করেছে বিবিএস। তাতে এ চিত্র পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালে এমন সমীক্ষা প্রকাশ করেছিল বিবিএস।
বিবিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিদেশে থাকা নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে একটি পরিবার বছরে গড়ে ৩ লাখ ২ হাজার ১৮৪ টাকা প্রবাসী আয় পায়। এর মধ্যে নগদ অর্থ আসে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৯৩ টাকা। ১২ হাজার ৬৯১ টাকার টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোবাইল ফোন, গয়নার মতো উপঢৌকন হিসেবে আসে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা পরিবারগুলো বেশি রেমিট্যান্স পায়। তাই তাদের অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে রেমিট্যান্সের অর্থ খরচ ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।
জাহিদ হোসেনের মতে, প্রবাসী আয়ের পাঠানো অর্থ কিছুটা ভিন্নভাবে বিনিয়োগে আসে। বিদেশ থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট পরিবার সাধারণত সঞ্চয় হিসেবে ব্যাংকে রাখে। ব্যাংকে থাকা অর্থই বিনিয়োগ হয়। কিন্তু বিনিয়োগ পরিবেশ না দিলে তা কীভাবে বিনিয়োগে আসবে। তবে প্রবাসী আয়ের ২৫ শতাংশের মতো বিনিয়োগযোগ্য অর্থ হিসেবে উদ্বৃত্ত থাকে; এটা জাতীয় অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের আনুপাতিক হারের সমান। উল্লেখ্য, জাতীয় অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২৪ শতাংশের সমান।
বিনিয়োগ হয় না: প্রবাসী আয়ের অর্থ খুব বেশি উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয় না। বিবিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, যত পরিবার প্রবাসী আয় পায়, তাদের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ কোনো বিনিয়োগ করে না। ২০১৫ সালের হিসাবে দেশে ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে বিনিয়োগের পরিমাণ (২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ ধরে) মাত্র ৪০০ কোটি ডলার। আবার এর সিংহভাগই (মোট প্রবাসী আয়ের ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ ধরে) টাকা খরচ হয় ওই প্রবাসীর বাড়িঘর মেরামত ও নির্মাণে। এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০০ কোটি ডলার। সামাজিক মান-মর্যাদার উন্নতির অংশ হিসেবে বাড়িঘর মেরামত বা নির্মাণ করা হয়।
প্রবাসী আয় পান এমন পরিবারগুলোর অর্ধেকের বেশি কোনো ধরনের সঞ্চয় করে না। বিদেশ থেকে যে অর্থ আসে, তার পুরোটাই খরচ করেন এসব পরিবারের সদস্যরা। মাত্র ৪১ দশমিক ৭১ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় করে থাকে।
খরচের ভার নারীর হাতে: পরিবারের প্রধান হিসেবে প্রবাসী আয়ের খরচ করার দায়িত্ব নারীর হাতেই ন্যস্ত রয়েছে। এসব পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষটি বিদেশে থাকেন। আর দেশে তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ নিকটাত্মীয়রা থাকেন। এমন পরিবারের যে অর্থ প্রবাস থেকে আসে, তার পুরোটাই খরচ করার দায়িত্ব পড়ে পরিবারের প্রধানতম সদস্য নারীর ওপর। বিবিএস বলছে, প্রবাসী আয় পায় এমন পরিবারগুলোর প্রায় ৫২ শতাংশের প্রধান একজন নারী। তাঁরাই সংসার চালান, প্রবাসী আয় খরচ করেন।
সাড়ে ৭৩ শতাংশই অর্ধশিক্ষিত: বিবিএসের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৮৬ লাখ নারী-পুরুষ দেশের বাইরে থাকেন। এর মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বা ৬৩ লাখের বেশি এসএসসি পাস করেননি। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে গেছেন ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু শ্রমিক হিসেবেই ৬২ শতাংশ বা ৫৩ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন।
বাংলাদেশ দশম: ২০১৫ সালে বিশ্বে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ২২০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এনেছে ভারত। ৬ হাজার ৩৯০ কোটি ডলার নিয়ে দ্বিতয়ি স্থানে রয়েছে চীন। বাংলাদেশের অবস্থান দশম ও দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়।