জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে এডিবির প্রতিবেদন

বাংলাদেশের ক্ষতি জিডিপির ৯%

বিশ্বের যে কয়টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বেশ কয়েক বছর ধরেই এ কথা বলে আসছে।

এবার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানাল, এই ঝুঁকির ফলে কতটা আর্থিক মাশুল গুনতে হবে বাংলাদেশকে। সংস্থাটির সর্বশেষ জলবায়ু ও অর্থনৈতিক প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অর্থনীতির বার্ষিক ক্ষতি বাড়তে বাড়তে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ দেশের অর্থনীতির ৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সহজভাবে বললে, ২১০০ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যদি হয় ৯১ টাকা, তাহলে বুঝতে হবে এটি হতে পারত ১০০ টাকা। কেননা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জিডিপির ৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

এডিবি বলছে, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে জিডিপির ২ শতাংশ। আর ২১০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু প্রশমন পদক্ষেপগুলো যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এই ক্ষতি ২ শতাংশের একটু ওপরে আটকে রাখা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ ১৩০ বিলিয়ন ডলার। আর বর্তমান জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশের পরিমাণ হচ্ছে ১২ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার।

এডিবি প্রকাশিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি নিরূপণ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিযোজন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসির সদস্য কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এডিবি যে ক্ষতির কথা বলেছে, তা ঠিকই আছে। বাংলাদেশ যে নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিকভাবে পদক্ষেপ না নিলে আগামী শতাব্দী আসার আগেই আমাদের দেশে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যাবে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে, কমে যাবে কৃষিজমি।’

খলীকুজ্জমান আরও বলেন, বৈশ্বিকভাবে ২০১৫ সালের মধ্যে একটি চুক্তি হওয়ার কথা, যা ২০২০ সাল থেকে বাস্তবায়ন হবে। তার মানে আগামী পাঁচ-ছয় বছরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে না। 

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে এডিবি। অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বিন্দু লোহানী বিশেষ অতিথি ছিলেন।

বাংলাদেশ ছাড়াও প্রতিবেদনে ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নষ্ট হবে। তবে বিশ্ব যদি এখনকার মতোই প্রাকৃতিক জ্বালানিকেন্দ্রিক পথ ধরে চলতে থাকে, তা হলে ২১০০ সালে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে।

এই দেশগুলোর প্রতিটির আলাদা ক্ষতির একটি হিসাবও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২১০০ সালে নেপালের জিডিপির ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, ভুটানের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারতের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, মালদ্বীপের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হবে।

এডিবির প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির অর্ধেকই কৃষি খাতে নিয়োজিত। অত্যধিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবদাহ এবং উৎপাদন মৌসুমের সময় কমে যাওয়ার মতো কারণে চাল, গম ও আলুর উৎপাদন বর্তমান সময়ের চেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে। এটি খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। দেশের ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি উপকূলীয় অঞ্চলে তিন কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ বাস করে। তাদের এখনকার চেয়ে বেশি ঝড়ের মুখোমুখি হতে হবে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেভাবে বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাতে প্রচুর জমি ভাঙনের শিকার হয়ে বিলীন হয়ে যাবে। কিছু জমির মাটিতে লবণাক্ততা বাড়বে। ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি এক মিটার বাড়ে, তাহলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে খুলনা বিভাগ। আর ঢাকা বিভাগের ১৪ শতাংশ জায়গা তলিয়ে যাবে। জলবায়ুর বিরূপ আচরণের কারণে বন, জলাভূমি এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ২০৩০ সালে বছরে আট কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০৫০ সালে বছরে ৩৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করতে হবে বলে উল্লেখ করেছে এডিবি।