এত দিন বাগান থেকে চা বস্তায় ভরে রপ্তানি করা হতো। চেনা এই দৃশ্য ধীরে হলেও পাল্টাচ্ছে। পরিমাণে কম হলেও এখন বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত স্টোরেও জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশের কয়েকটি ব্র্যান্ডের চা।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চায়ের বাজারে শীর্ষস্থানে থাকা ইস্পাহানি গ্রুপের পাঁচটি, কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ‘টিটুলিয়া’ অর্গানিক, আবুল খায়ের গ্রুপের ‘সিলন টি’, ওরিয়ন গ্রুপের ‘ওরিয়ন টি’ এবং এসিআই বাংলাদেশের ‘টেটলি টি’ ব্র্যান্ডের নামে চা রপ্তানি করা হচ্ছে।
চা চাষ শুরুর ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও ব্র্যান্ড তৈরিতে কার্যত পিছিয়েই ছিল বাংলাদেশ। স্থানীয় বাজারে ব্র্যান্ডের চা বিক্রি হলেও রপ্তানিতে খোলা চা ছিল ভরসা।
বাংলাদেশের বাজারে শীর্ষস্থানে থাকা ইস্পাহানি গ্রুপ আন্তর্জাতিক বাজারে বহু আগে থেকেই নিজেদের ব্র্যান্ডের চা রপ্তানি করছে। লন্ডনের হ্যারডস স্টোরের তাকে পাওয়া যাবে মির্জাপুর ব্রেকফাস্ট টি, শ্রীমঙ্গল গ্রিন টি কিংবা ব্লেন্ডারস চয়েস ব্ল্যাক টি। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ব্র্যান্ডের নাম ‘ইসপি সুপার’। জাপানে ‘স্টার অব বেঙ্গল’ নামে বিক্রি হচ্ছে ইস্পাহানির চা। আর যুক্তরাষ্ট্রে মির্জাপুর ব্র্যান্ডে পাওয়া যাচ্ছে ইস্পাহানির চা।
ইস্পাহানি টি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক শাহ মঈনুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিদেশেও ব্র্যান্ডের নামে চা রপ্তানি আরও বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইস্পাহানি। ব্র্যান্ডের চা রপ্তানিতে মূল্য সংযোজন যেমন বেশি হয়, তেমনি দেশেরও সুনাম হয়।
ব্র্যান্ডের চা রপ্তানিতে আরেকটি নাম কাজী অ্যান্ড কাজীর ‘টিটুলিয়া’ ব্র্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের জৈব খাদ্যপণ্যের বহুজাতিক চেইন শপ ‘হোল ফুডস’–এর তাকেও পাওয়া যাবে বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া বাগানের চা ‘টিটুলিয়া’। যুক্তরাজ্যেও চায়ের এই ব্র্যান্ড সুপরিচিত। গত বছর বৈশ্বিক খাদ্য ও পানীয় পুরস্কার ‘গ্রেট টেস্ট’–এর তালিকায় কাজী অ্যান্ড কাজীর ‘জেসমিন’, ‘ওলং’ ও ‘হোয়াইট টি’ পুরস্কার পেয়েছে। অর্গানিক চা উৎপাদনের জন্য বাগানটির বৈশ্বিক স্বীকৃতিও রয়েছে।
কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শোয়েব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের চারটি দেশে টিটুলিয়া ব্র্যান্ডের চা বাজারজাত করা হচ্ছে। তেঁতুলিয়া বাগানের চায়ের ব্র্যান্ডিং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে তাঁরা কাজ করছেন। এখন প্রতিবছর বিদেশের ক্রেতারা এই বাগান সরেজমিন দেখতে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিমসন কাপ কফির প্রতিনিধিদলও ঘুরে গেছে বছর দুয়েক আগে।
আবুল খায়ের গ্রুপ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতসহ কয়েকটি দেশে ‘সিলন’ ব্র্যান্ডের নামে চা রপ্তানি করছে। অন্যদিকে পরিমাণে কম হলেও গেল বছর ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, সাইপ্রাস, ব্রুনেই, জাপান, কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশে চা রপ্তানি করছে ‘ওরিয়ন টি’।
চা বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ১৯৮২ সালে ৩ কোটি ৪৪ লাখ কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয় ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সে সময় কমবেশি ২৬টি দেশে চা রপ্তানি হতো। তখন বাল্কে বা বস্তায় ভরে চা রপ্তানি হতো।
দেশের চাহিদা বাড়তে থাকায় চা রপ্তানি কমে কয়েক বছর আগে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যায়। চায়ের উৎপাদন বাড়তে থাকায় এখন আমদানি কমে আবার ধীরে ধীরে রপ্তানি বাড়ছে। গত বছর ২১ লাখ ৭০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করা হয়। এর বড় অংশই ব্র্যান্ডের চা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখন বছরে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের চা উৎপাদিত হয়। আমদানি–রপ্তানি হয় আট বিলিয়ন ডলারের চা। বৈশ্বিক বাজার ধরতে ব্র্যান্ডের চা রপ্তানির বিকল্প নেই বলে রপ্তানিকারকেরা জানান।