এলডিসি থেকে উত্তরণ

২০২১–এ মিলতে পারে বড় সুখবর

জাতিসংঘ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের বের হওয়ার বিষয়ে আগামী ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত সুপারিশ করতে পারে।

২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। মহিমান্বিত এ বছরে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর হতে পারে—স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়া। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করতে পারে। অবশ্য এবার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশকে আরও তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এলডিসি হিসেবে অন্তর্ভু‌ক্ত হয়। তিন বছর পরপর জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসির সদস্যদেশগুলোর মূল্যায়ন করে থাকে। সেই মূল্যায়নে ঠিক করা হয়, কোন কোন দেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে যাচ্ছে। দুবার এ মান অর্জন করতে হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—তিনটি সূচকের মধ্যে অন্তত দুটিতে নির্ধারিত মান অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট মানদণ্ডের দ্বিগুণ করতে পারলেও এ তালিকা থেকে বের হওয়া যায়।

নিয়ম হলো, প্রথম মূল্যায়নে মান অর্জন করলে পরের তিন বছর একই ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে হবে। পরের মূল্যায়নে মান অর্জন করলে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। তারপর আরও তিন বছর অপেক্ষা করতে হয় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের অনুমোদন পাওয়ার জন্য। সব মিলিয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণের স্বীকৃতি পেতে কমপক্ষে ছয় বছর লাগে।

সিডিপির ২০১৮ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকের সব কটিতেই নির্দিষ্ট মান অর্জন করেছে। আগামী ২২-২৬ ফেব্রুয়ারি সিডিপির পরবর্তী মূল্যায়ন হবে। সেখানে বাংলাদেশ চূড়ান্ত সুপারিশ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূলত এই চূড়ান্ত সুপারিশ পেলেই ধরে নেওয়া হয়, একটি দেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার সব যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে। বিষয়টি পরের তিন বছর শুধুই পর্যবেক্ষণ করে জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে পাওয়া বাণিজ্যসুবিধা হারাবে। এখন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ যেভাবে শুল্কমুক্ত কোটাসুবিধা, ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে সুবিধা, সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তাসহ অন্যান্য যে বাণিজ্যসুবিধা পায়, সেগুলো তখন প্রত্যাহার হওয়ার কথা।

আবার এলডিসি থেকে বের হলে অর্থনৈতিক সক্ষমতার মর্যাদা প্রকাশ পাবে। তখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে। সর্বোপরি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

২০১৮ সালে সিডিপির প্রাথমিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই যোগ্যতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। যদি আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের চূড়ান্ত মূল্যায়নেও তিনটি সূচকে মান অর্জন করে, তাহলে বাংলাদেশ হবে এলডিসির মধ্যে একমাত্র দেশ, যে দেশটি তিনটি সূচকেই মান অর্জন করে এলডিসি থেকে বের হচ্ছে। অবশ্য ২০১৮ সালের মতো ২০২১ সালেও একই মান ঠিক রেখেছে সিডিপি। ২০১৮ সালের সিডিপির মূল্যায়নে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশের ২৫ পয়েন্ট রয়েছে। এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে এ সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা এর নিচে থাকতে হবে। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট পেতে হবে। বাংলাদেশের রয়েছে ৭২ দশমিক ৮ পয়েন্ট। মাথাপিছু আয় সূচকে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার থাকতে হবে। ২০১৮ সালের হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৭২ ডলার।

জাতিসংঘ তার সদস্যদেশগুলোকে উন্নত ও উন্নয়নশীল—দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় রাখা হয়। ১৯৭১ সালে প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশের এ তালিকা করা হয়। বর্তমানে ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশ আছে। এ পর্যন্ত মালদ্বীপসহ মোট পাঁচটি দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে। এর মধ্যে বতসোয়ানা ও ইকুয়েটরিয়াল গিনি শুধু মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করে এলডিসি থেকে বের হয়েছে। দেশ দুটি অন্য দুই সূচকে কখনোই নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি। আবার মালদ্বীপ, সামোয়া ও কেপভার্দে—তিনটি দেশ অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে মান অর্জন করতে পারেনি। তারা অর্থনৈতিক দুর্বলতা নিয়েই এলডিসি থেকে বের হয়েছে।