গভর্নর মোস্তাকুর রহমান
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ধাক্কা সামলাতে করণীয় নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক

মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতির আসন্ন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আট অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলেছেন, সংকট কতটা হবে তা এখনো পরিষ্কার না। বৈশ্বিক সংকট হলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবে। এ জন্য রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া সুদহার কমাতে এখনই নীতি সুদহারে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আসন্ন চাপ কেটে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

আজ শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সভায় দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদেরা এই পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই তা গ্রাহক পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যোগ দিয়ে নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এক সদস্যের পদত্যাগ ও অর্থনীতিবিদদের বিরোধিতার মুখে সেই সভাটি ভেস্তে যায়। এর মধ্যে ইরানে আমেরিকার হামলা ও পাল্টা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা বুঝতে দেশের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সভা করার উদ্যোগ নেন গভর্নর।

সভায় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে গভর্নরের পাশাপাশি চার ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দেওয়া হয় একটি কমিটি গঠন করতে, যারা সময়ে সময়ে দেশের অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত জানাবে। যাতে কোনো আতঙ্ক তৈরি না হয়।

সভায় আলোচনা হয় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে ডলার ও রিজার্ভের ওপর আবারও চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও ধাক্কা আসতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে সরকারের নীতি হলো দেশের বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা। এমন পরিস্থিতিতে কী ধরনের নীতি নেওয়া যায় ও সরকার কী ধরনের নীতি পারে, তা জানতে চাওয়া হয় অর্থনীতিবিদদের কাছে।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, গভর্নর জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি সততার সঙ্গে কাজ করবেন। কোনো রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ব্যাংকগুলোকেও রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে বলেছেন।

সভায় উপস্থিত অর্থনীতিবিদেরা জানান, এখন যে বৈশ্বিক চাপের আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা এড়ানোর সুযোগ কম। কীভাবে কম ক্ষতি হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বর্তমানে যে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) আছে, তা ধরে রাখতে হবে। রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করে আমদানি করা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আনা কঠিন হওয়া ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুর থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখনই তা ভোক্তা পর্যায়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।

তাঁরা আরও পরামর্শ দেন বিশ্বব্যাংকসহ যত বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নিতে হবে। তেলের আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বাড়তি ঋণের উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের যাতায়াতে সমস্যার কারণে প্রবাসী আয়ে ধাক্কা আসতে পারে। তবে যারা আয় পাঠাতে চায়, তাদের আনার ব্যবস্থাটা আরও মসৃণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদেরা পরামর্শ দেন, এখনো মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। আরও বেড়ে যাক এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সুদের হার কমাতে এখনই নীতি সুদহার কমানো ঠিক হবে না। এ জন্য যুদ্ধের পর পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে চাহিদামতো ঋণ পায়, সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।