বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো ধরনের পেনশন পান না। এ কারণে সরকার চায়, এসব ব্যাংকের কর্মীরা সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির (স্কিম) আওতায় আসুক। এ লক্ষ্যে তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মসূচিও বাছাই করেছে সরকার। এর নাম ‘প্রগতি’।
আজ বুধবার ঢাকায় সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা বৈঠকে এ কথা উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা (এমডি) উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আয়েশা হক।
অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বৈঠকে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারে অন্তত একজন করে সদস্যকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাংক খাতকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ব্যাংকগুলোর এমডিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রগতি নামের স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের সব শাখায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের জন্য আলাদা ডেস্ক স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া ব্যানার প্রদর্শন এবং ব্যাংকের নিজস্ব বিপণন কার্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রগতি স্কিমের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন’ শীর্ষক অংশে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বার্ধক্যের সময়ে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেনশন তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
* প্রগতি, প্রবাস, সুরক্ষা ও সমতা—এই চার স্কিমে মোট নিবন্ধিত সদস্য ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জন।* জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে।* মাসিক চাঁদা ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। অবসরের পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন।
প্রবন্ধে এ কথা উল্লেখ করে জানানো হয়, দেশে বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নিবন্ধিত শ্রমিক-কর্মীর বড় অংশই অবসর-পরবর্তী কোনো আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় নেই। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশনের আওতায় থাকলেও বেসরকারি খাতে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত। এ শূন্যতা পূরণে ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থার অধীন বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রগতি স্কিম একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে।
প্রগতি স্কিমকে আরও আকর্ষণীয় করতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালু, নমিনিদের জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা বিবেচনা এবং ব্যাংকের আউটসোর্সিং কর্মীদেরও স্কিমটিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় পেনশন আছে। যেসব ব্যাংকে নেই, সেগুলোর কর্মীরা প্রগতি স্কিমে এলে অবসরজীবনে তাঁরা পেনশন ভোগ করতে পারবেন।মো. সুরাতুজ্জামান, নির্বাহী চেয়ারম্যান, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ
প্রগতি স্কিমের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলা হয়, এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য বিশেষভাবে প্রণীত। কোনো প্রতিষ্ঠান স্কিমে যুক্ত হলে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বহন করবে। মাসিক চাঁদার পরিমাণ ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। অংশগ্রহণকারীরা অবসরের পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া চাঁদার ওপর আয়কর রেয়াত রয়েছে। পেনশনও আয়করমুক্ত থাকবে। ৬০ বছর পূর্তির পর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে তোলার সুযোগও থাকবে। বিনিয়োগে রয়েছে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, গত ৩০ মে পর্যন্ত প্রগতি, প্রবাস, সুরক্ষা, সমতা—এই চার স্কিমে মোট নিবন্ধিত সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জন। জমার পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা, যা এখন মুনাফাসহ দাঁড়িয়েছে ২৮৬ কোটি টাকা। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এর মধ্যে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে পেনশন স্কিমের চাঁদা নেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জানতে চাইলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় পেনশন আছে। যেসব ব্যাংকে নেই, সেগুলোর কর্মীরা প্রগতি স্কিমে এলে অবসরজীবনে তাঁরা পেনশন ভোগ করতে পারবেন।
বেসরকারি ব্যাংকের কী পরিমাণ কর্মী রয়েছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুরাতুজ্জামান জানান, তিনি জানতে পেরেছেন, এ সংখ্যা এক লাখের বেশি।