রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

এলডিসি উত্তরণ টেকসই করতে পাঁচ পক্ষ নিয়ে সংস্কার হবে: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি যাতে চাপে না পড়ে, সে জন্য বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কাজে যুক্ত করা হচ্ছে পাঁচ পক্ষকে। পক্ষগুলো হলো—জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন জোট। বাড়তি তিন বছরকে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির সুযোগ হিসেবে সরকার কাজে লাগাতে চায়।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আজ রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে এ রূপান্তর হতে হবে টেকসই।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এলডিসিভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। তাই অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার তিনটি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ সংস্কার পরিকল্পনা করছে। এগুলো হলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তৈরি হওয়া বাহ্যিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত আগাম প্রস্তুতির অভাব।

ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে সংস্কার

সংস্কারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, বিনিয়োগের নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানিপণ্যের তালিকা সম্প্রসারণে কাজ করা হবে।

টেকসই শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরকার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে উল্লেখ করে এই উপদেষ্টা বলেন, এ লক্ষ্যে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নতুন বাজার খুঁজবে সরকার

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপদেষ্টা বলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারলে সরকারের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। এ জন্য এলডিসি উত্তরণ নিয়ে প্রতিটি আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সরকারের উদ্যোগে যুক্ত পাঁচ পক্ষ হলো বাংলাদেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন জোট। উপদেষ্টার মতে, এ ধরনের সর্বসম্মত অংশীদারত্ব আগে দেখা যায়নি। পাঁচ পক্ষের অংশগ্রহণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়াবে।

সংস্কারে পাশে থাকবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক

জাতিসংঘের ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবে জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে কারিগরি সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক।

এ ছাড়া সরকারের চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচিতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারের সামনে এখন বাড়তি তিন বছরের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। এ সময়ে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অগ্রগতি হলে এলডিসি উত্তরণের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তিও তৈরি হবে।