বিদেশি ঋণ শোধ করতে পারছে না আফ্রিকার দেশ ঘানা

অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ঋণখেলাপি হতে চলেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা। কারণ, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণ এখন আর শোধ করতে পারছে না দেশটি। খবর রয়টার্স ও আল-জাজিরার।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ঋণ পরিশোধের অক্ষমতা থেকে বোঝা যায়, দেশটি অর্থনীতির বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। তবে ভবিষ্যতে কীভাবে ঋণ পরিশোধ করা যায়, তা নিয়ে ঋণদাতা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছে ঘানা সরকার।

গত সোমবার ঘানার বেশির ভাগ বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ কার্যক্রম স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। ঘানার অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, এখন থেকে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে ইউরো বন্ড, দ্বিপক্ষীয় ঋণসহ যেকোনো বাণিজ্যিক ঋণ পরিশোধ করবে না দেশটি। তবে নতুন স্থগিতাদেশের মধ্যে বহু পাক্ষিক ঋণের অর্থ প্রদান, ১৯ ডিসেম্বরের পর নেওয়া নতুন ঋণ বা নির্দিষ্ট স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যসুবিধা-সম্পর্কিত ঋণ অন্তর্ভুক্ত হবে না।

চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি ঋণমান সংস্থা ঘানার ঋণমান কমিয়ে দেয়। বলা হয়, দেশটি নতুন ইউরো বন্ড ইস্যু করতে পারবে না। এরপরই ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দেশটিতে সংকট শুরু হয়। এরপর ঘানার ঋণ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ দেশীয়, বাকিগুলো বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থার।

গত সেপ্টেম্বরে ঘানার ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি ছিল ৩৪০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। অথচ এক বছর আগেও একই সময়ে দেশটির উদ্বৃত্ত ছিল ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমানে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারি রাজস্বের ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করছে দেশটির সরকার।

এসব কারণে দেশটিতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। গত নভেম্বরে ঘানার মূল্যস্ফীতি ৫০ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত অক্টোবরে ঘানার মূল্যস্ফীতি ছিল ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশটিতে আবাসন, পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতের খরচ সর্বোচ্চ ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

গত সেপ্টেম্বর শেষে ঘানার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৬৬০ কোটি (৬.৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার, যা দেশটির তিন মাসের কম আমদানি ব্যয়ের সমান। অথচ গত বছরের শেষেও দেশটির রিজার্ভ ছিল প্রায় ৯৭০ কোটি মার্কিন ডলার। এ বছর ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রার মান প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। সংকট মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় হ্রাস করা, নীতি সুদহার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ঘানা সরকার।

অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণ দিয়ে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কেনার জন্য নতুন নীতি প্রণয়নে কাজ করছে দেশটি। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহামুদু বাউমিয়া সম্প্রতি এ তথ্য জানান। পশ্চিম আফ্রিকার এ দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সোনা, তেল ও কোকোয়া উৎপাদন করে।

এদিকে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে দেশটি। তবে আইএমএফের সঙ্গে ঋণ চুক্তির ফলে বেশ কিছু খাতে ভর্তুকি কমাতে হয় ঘানাকে। এরপর দেশটিতে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে গত মাসে চুক্তির নিন্দা করে ও দেশটির রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চেয়ে রাজধানী আক্রায় বিক্ষোভও করেন দেশটির সাধারণ মানুষেরা। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গত এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে দেশটি।