দেশীয় বস্ত্রকলকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বন্ড সুবিধায় ১০-৩০ কাউন্টের কটন (তুলা) সুতা আমদানির সুবিধা বাতিল করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানি করতে পারবেন। সেই সুতা দিয়ে প্রস্তুত করা তৈরি পোশাক রপ্তানি হওয়ার পর ওই ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে।
এনবিআর গতকাল সোমবার এক আদেশে বন্ড সুবিধায় ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানির সুবিধা বাতিল করে। এতে বলা হয়, বস্ত্র খাতের সমস্যা পর্যালোচনা ও সমাধানের জন্য গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ২০ আগস্ট। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানি বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এনবিআরের আদেশে বলা হয়, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকেরা এ সুতা আমদানি করতে হলে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর বা বিটিএমএর প্রত্যয়নপত্রের সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থ নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে প্রস্তুত তৈরি পোশাক রপ্তানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রত্যয়ন দাখিল করে ওই ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত হবে।
এনবিআরের এ সিদ্ধান্তে বস্ত্রকলমালিকেরা খুশি হলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাঁরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্প এ বন্ড ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। সুতা আমদানিতে বন্ড ব্যবস্থা বাতিল করলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও করেছেন তাঁরা।
বাণিজ্যমন্ত্রীকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর চিঠি
এদিকে এনবিআরের আদেশ জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ আজ মঙ্গলবার তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যৌথভাবে বাণিজ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেছেন, গত মাসের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি বন্ধের বিষয়ে সর্বসম্মতিক্রমে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ চিঠিতে বলা হয়, আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানির ক্ষেত্রে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানি; রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুতার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ স্থানীয় সুতার কল থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক এবং বাকি অর্ধেক আমদানি সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই সভায় এমন বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সভা শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে আলোচনা উঠলে বলা হয়, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সভার আলোচনাবহির্ভূত এ ধরনের বিষয় কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করা তাদের বিস্মিত করেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি আদেশ কম থাকায় বাজারে সুতার চাহিদা তুলনামূলক কম। তারপরও স্থানীয় বাজারে সুতার দাম বাড়ছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশে একচেটিয়া ব্যবসা করার জন্য তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জিম্মি করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিটিএমএ খুশি
এদিকে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি বন্ধ হওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ। তারা গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছে, নতুন সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় সুতার চাহিদা বাড়বে। বন্ধ ও আংশিক বন্ধ বস্ত্রকল আবার সচল হবে। এ ছাড়া দেশীয় সুতা ব্যবহারে মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়বে। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি করলে তা স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি বা অপসারণের সুযোগ কমে আসবে।
বিটিএমএর তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮ শতাধিক টেক্সটাইল মিল বা বস্ত্রকল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিল বা সুতার কল ৫২৭টি। খাতটিতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। নিট পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতা সরবরাহ করে স্থানীয় বস্ত্রকল।
বিরোধিতা কেন
জানতে চাইলে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানি করতে ৪০ শতাংশে কর লাগে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করও দিতে হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকের জন্য এটি বাড়তি বোঝা। তা ছাড়া সবকিছু যথাযথভাবে করেও ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা জটিলতম কাজ। এতে কাজ করে রপ্তানি করা কঠিন হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে সুতা আমদানি চালু করলেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ হবে না। তার কারণ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এটি হয়। তাঁরা যথাযথ নজরদারি করলেই এত এত বিধিনিষেধ না দিয়েই বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব।
দেশের বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দিতে গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। এরপর বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করে ভারত। চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশীয় বস্ত্র খাতকে চাঙা করতে সুতা ব্যবহারে নগদ সহায়তা দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে পাঁচ শতাংশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। এতে সরকারের আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলেছি। বর্তমানে তিনি বিদেশে আছেন। দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’