২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতি জটিল অবস্থায় আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের সমস্যা, বিনিয়োগ সমস্যা ও জ্বালানিসংকট—সব মিলিয়ে নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকারকে এখন এসব সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। সেই সঙ্গে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্য ও আবাসনের দাম যথাক্রমে ৮ দশমিক ২৯ ও ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। অনেক পণ্য ও সেবার দাম প্রায় ২১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাপের মুখে আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামানো সম্ভব। তবে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানির খরচ ও পবিত্র রমজানের কারণে দাম আবার বাড়তে পারে।
বৈদেশিক রিজার্ভ কিছুটা ভালো অবস্থায় এসেছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে এটি মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের কারণে রিজার্ভে স্থিতিশীলতা এসেছে। গত জানুয়ারিতে মাসে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন বা ৩১৭ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে—দেশের ইতিহাসে যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ আশা করছে, বছরের শেষে রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
দেশের ব্যাংক খাত এখনো নানা সমস্যার মধ্যে আছে। খেলাপির ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৩৫ শতাংশের বেশি। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ অনেক কমে গেছে। অনেক ব্যাংক ন্যূনতম মূলধনও রাখতে পারছে না। দুর্বল ব্যাংক একত্র করা, নিরীক্ষা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া—সরকার এমন নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
রাজস্ব আদায়ও কম। দেশের কর-জিডিপির অনুপাত মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ। অনেক মানুষ আয়কর দেন না। অতিরিক্ত কর অব্যাহতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে রাজস্ব আদায় কঠিন হয়ে গেছে। এনবিআর এখন নতুন নীতি ও অটোমেশন চালু করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুষ্ঠু করব্যবস্থা ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে না। বিদেশি বিনিয়োগও কম। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিট বিদেশি বিনিয়োগ মাত্র ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন বা ১৪১ কোটি ডলার। প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং ভিয়েতনাম অনেক বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। উচ্চ সুদ, জ্বালানিসংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগ আসতে দেরি হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে রপ্তানিতেও নতুন চাপ আসতে পারে (যদিও উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ)।
শিল্প ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কঠিন। তৈরি পোশাক খাতের অনেক কারখানা বন্ধ। রপ্তানির ৮০ শতাংশ এক খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি। প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন কর্মপ্রার্থী শ্রমবাজারে আসেন। জিডিপি বাড়লেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হচ্ছে না। জ্বালানি খাতও সংকটপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও ব্যয় বেশি। আমদানির ওপর নির্ভরতা ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ভর্তুকি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মাত্র ৫ শতাংশের নিচে।
বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজার। আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের ভূমিকা আছে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে নতুন বাণিজ্যচুক্তি ও বাজার বহুমুখীকরণ অপরিহার্য।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, নিম্ন রাজস্ব ও অপ্রতুল কর্মসংস্থানের চাপে আছে। প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও রিজার্ভের উন্নতিতে কিছু সম্ভাবনার সংকেত দেখা যাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক ম্যান্ডেটের জন্য দৃশ্যমান সংস্কার ও কার্যকর নীতি দরকার। এসব কারণে ২০২৬ সাল নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বছরটি তাদের পরীক্ষার বছর।
আসিফ ইব্রাহিম ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি