খন্দকার আবদুল মুক্তাদির
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির

বিশেষ সাক্ষাৎকার: খন্দকার আবদুল মুক্তাদির

এলডিসি উত্তরণের আগে যত বেশি বাণিজ্যচুক্তি করা যায়, সেই চেষ্টা চলছে

বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, এলডিসি উত্তরণ, বাণিজ্যচুক্তি ও রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা নিয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ফখরুল ইসলাম

প্রশ্ন

আপনি একই সঙ্গে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট—তিনটি পরস্পরনির্ভর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের উৎপাদন ও বাণিজ্যের প্রধান তিনটি দুর্বলতা কী দেখেছেন?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: সমস্যাগুলো এক দিনে তৈরি হয়নি। যিনি বিনিয়োগ করবেন তাঁর জন্য বিশ্বের একটি বিরাট অংশ অবারিত। বিদেশি বিনিয়োগকারীর কথা বলছি। আগে বিশ্বব্যাংক সহজে ব্যবসা করার যে সূচক প্রকাশ করত, সেটি এখন আর প্রকাশ করে না। তবে সর্বশেষ যখন প্রকাশ করা হয়েছিল, তখনো বাংলাদেশ নিচের সারিতে ছিল। এটি আমাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা।

নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য জ্বালানির নিশ্চয়তা দরকার। একইভাবে ব্যবসা বা বিনিয়োগের পথে যেসব প্রক্রিয়াগত জটিলতা আছে, সেগুলোও কমানো চাই। সরকারের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার খরচ কমিয়ে আনা—এসব বিনিয়োগের জন্য উৎসাহজনক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতির ধারাবাহিকতা। আজ একটি নীতি নেবেন, তা যদি ছয় মাস বা এক বছর পর বদলে ফেলেন, তাহলে বিনিয়োগকারীর জন্য অসুবিধা। সহজে লাইসেন্স, অনুমতি, ছাড়পত্র ইত্যাদি পাওয়া এখানে কঠিন। আবার নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত নয়, সরবরাহব্যবস্থার খরচও প্রতিযোগিতামূলক নয়। এ ছাড়া বজায় নেই নীতির ধারাবাহিকতা। এ দুর্বলতাগুলো পেয়েছি এবং কাটানোর জন্য কাজ করছি।

প্রশ্ন

এ জন্য কী কাজ করছেন?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছি, একজন নতুন বিনিয়োগকারী যদি বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চান, তাহলে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার পর্যায় পর্যন্ত যেতেই তাঁর ৩৫৫ দিন লাগে। প্রক্রিয়া এত জটিল করে রাখা হয়েছে যে বিনিয়োগকারী কিছুদিন চেষ্টা করার পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আমরা এ যাত্রা ১৪ দিনে নামিয়ে আনছি। ১৪ দিনে অবশ্য সব চূড়ান্ত ছাড়পত্র বা লাইসেন্স পাওয়া বোঝাচ্ছি না। এ সময়ের মধ্যে একজন বিনিয়োগকারী প্রয়োজনীয় যেসব কাগজপত্র পাবেন, সেগুলোর ভিত্তিতে তিনি এলসি খুলতে পারবেন।

চূড়ান্ত অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স বা পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো যেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের মতো একটি জায়গা থেকে সমন্বয় করতে পারেন, সেই প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার পর যে ব্যবস্থা দাঁড়াবে, সেটি বিশ্বের অন্য ভালো ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয় হবে।

এটি হচ্ছে একটি দিক। জ্বালানি সমস্যার কথা তো আমরা জানি। বাংলাদেশের কূপগুলোর সক্ষমতা ক্রমাগত কমে আসছে। কূপগুলো থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করি। আর বাইরে থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস আনি, যে দুটির মোট সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ থেকে আমরা ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাই। সব উৎস মিলিয়ে আমরা জোগান দিই ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

এখন নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী সবাইকে একসঙ্গে গ্যাস দিতে চাইলে আরও টার্মিনাল করতে হবে, যা এক দিনে সম্ভব নয়। একটি ভাসমান টার্মিনাল করার আদেশ দেওয়ার পরও দুই বছর সময় লাগে। আবার টার্মিনাল থেকে সমুদ্রের নিচ দিয়ে মূল গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে পাইপলাইন যুক্ত করতেও সময় লাগে। অবকাঠামো তৈরিতে যে সময় লাগবে, তার মধ্যেই যেন একাধিক ভাসমান টার্মিনাল করা যায়, সে জন্য সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়মিত তদারক করছেন। সেই সময় পার হওয়ার পর আশা করি, গ্যাস সরবরাহের অপ্রতুলতা থাকবে না। পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট আসবে।

প্রশ্ন

এলডিসি উত্তরণ নিয়ে বাংলাদেশের চূড়ান্ত অবস্থান কী? উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়লে সেই সময়ের মধ্যে কোন সংস্কারগুলো অবশ্যই শেষ করবেন?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: এ ব্যাপারে আমরা একটি বিশদ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। জাতীয় পর্যায়ে একটি পর্যবেক্ষণ কাঠামো করা হয়েছে, যার প্রধান অর্থমন্ত্রী। আমিও আছি, আরও মন্ত্রী আছেন। এলডিসি উত্তরণ একসময় হবেই। আমরা চাই উত্তরণটি যেন মসৃণ হয় এবং আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা না আসে। যদি তিন বছর সময় পাওয়া যায়, তাহলে সেই সময়টাকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যাবে। প্রথমত, ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগের বাধা দূর করা হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানির নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। তৃতীয়ত, সরকারের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধিসহ যেসব সরকারি সেবা মানুষের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই ডিজিটালভাবে দেওয়া সম্ভব, সেগুলো ডিজিটাল করা হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হবে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ধরে রাখা। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রশ্ন

কতগুলো দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা এ ধরনের বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা চলছে। কোনো কোনো দেশের সঙ্গে এ বছরই শেষ করা সম্ভব হতে পারে। কোনোটি আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গেও আলোচনা এগোবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে উত্তরণের আগে যত বেশি সম্ভব গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন করা। কারণ, একজন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে কারখানা করলে শুধু বাংলাদেশের বাজার দেখবেন না, তিনি দেখবেন বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের অন্য বাজারে পণ্য নেওয়া কতটা সহজ। আমরা চাই বাংলাদেশকে বিনিয়োগের একটি রপ্তানি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখবেন বিনিয়োগকারীরা।

প্রশ্ন

ইইউর বাজারে সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস ও এফটিএ—দুই পথেই এগোচ্ছে। তারা তো শ্রম অধিকার, পরিবেশ, সুশাসন, সরকারি ক্রয় ও শুল্ক কমানোর কথা বলছে?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: সরকারি ক্রয়, সুশাসন, স্বচ্ছতা—এসব তো নিজেদের প্রয়োজনেই করতে হবে। ইইউ আমাদের বড় রপ্তানি গন্তব্য। পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাট, কৃষিপণ্যসহ অন্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হলেও এ বাজার গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের সঙ্গে আস্থা ও স্বচ্ছতার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কয়েক দিন আগে আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছি। বাংলাদেশ প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যে সুবিধা পাবে কোরিয়া থেকে। আর কোরিয়া পাবে ৮৭ শতাংশ পণ্যে সুবিধা। ইইউর ক্ষেত্রেও চুক্তি হবে, যাতে আমরা চাইব সব যেন উইন উইন হয়।

শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচকভাবে এগোনো আমাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজন। এই সরকারের সময়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনে শ্রম আইন পাস করেছি। গত মার্চ মাসে ইইউর রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। একটি লম্বা অশুল্ক বাধার তালিকা দিয়েছিলেন তাঁরা। এগুলো দূর করতে মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। এ কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং ইইউসহ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচেষ্টা অত্যন্ত দৃঢ়।

প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপে দেশটির ভোক্তা চাহিদা ও বাংলাদেশের রপ্তানিতে কী প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন?

খন্দকার আবদল মুক্তাদির: শুল্ক আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র যে পণ্য আমদানি করবে, তার দাম বাড়বে। বাড়তি দামের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হবে। রপ্তানি সংকুচিত হলে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মাসিক আয় যদি সাড়ে তিন হাজার ডলার হয়, তা থেকে একটি অংশ ভোগ্যপণ্যের জন্য ব্যয় হয়। প্রতিটি পণ্যের দাম যদি বেড়ে যায়, তাহলে তাঁদের সঞ্চয় থেকে খরচ করতে হবে। সঞ্চয় না থাকলে খরচ কমাতে হবে। ফলে সব ধরনের পণ্যের ওপরই এর প্রভাব পড়বে।

প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির
প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। তারপরও বাংলাদেশ চুক্তির অঙ্গীকার অনুযায়ী কেনাকাটা করছে। চুক্তি নিয়ে আপনাদের অবস্থান কী?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: এ পর্যন্ত এ ধরনের তিনটি চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটিকে ঠিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বলা যাবে না, যেটা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেটা হয়েছে, তার বিভিন্ন শর্তের অংশ হিসেবে যে কিছু বিষয় প্রতিপালিত হচ্ছে, তা আপনি বলতে পারেন। এর সরাসরি বিরোধিতা করা মুশকিল। তবে চুক্তিটি এখনো সংসদে অনুমোদিত হয়নি। এটিকে নিয়মিতকরণ ও আনুষ্ঠানিক করার জন্য যে ধাপগুলো পেরোতে হবে, সেগুলোও সম্পন্ন হয়নি। তাই চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর নয়।

প্রশ্ন

বাস্তবে তো কার্যকর।

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর বলা যাবে না। যেমন বিশ্বে উড়োজাহাজ বিক্রি করে, এমন বড় দুটি প্রতিষ্ঠান আছে—বোয়িং ও এয়ারবাস। আপনি যদি একটি উড়োজাহাজ কিনতে যান, মূলত এ দুটির একটি থেকেই কিনতে হবে।

প্রশ্ন

উড়োজাহাজ বাদ দিলেও গম, তুলা, ভোজ্যতেল, এলএনজি তো আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি করে কিনছি।

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: গম কেনার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি রয়েছে, যার আমিও একজন সদস্য। গম কেনায় অনেক বিষয় বিবেচনায় নিই। যেমন মার্কিন গমের ক্ষেত্রে অপচয়ের হার কম। এলএনজির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছি। ওই প্রতিষ্ঠান মোট ১১৭ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে। প্রথম দুই অর্থবছরে নির্দিষ্ট সময়ে ১৪টি কার্গো আসবে, বাকি কার্গোগুলো আসবে পরে। চুক্তির মূল্য নির্ধারণের মডেলটিকে যদি আমরা গড় করি, তাহলে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম দাঁড়ায় ১০ ডলারের নিচে। এ কারণে এটিকে ভালো চুক্তি মনে হয়েছে। কারণ, আমরা স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হই।

প্রশ্ন

শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করছে অথবা বন্ধ রয়েছে। এ নিয়ে কী পরিকল্পনা?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: ৫০টি কারখানা আছে—২৫টি পাটকল ও ২৫টি বস্ত্রকল। এর মধ্যে কয়েকটিকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি ইজারার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। তবে সবকিছুই দরপত্রের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় করা হচ্ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সার কারখানাগুলো গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে সরকারই চালাবে। বিপুল পরিমাণ সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব কারখানা পুরোপুরি চালু করতে পারলে এক ছটাক সারও হয়তো আমদানি করতে হবে না। বরং বাড়তি উৎপাদন হলে রপ্তানিও করতে পারব।

চিনিকল নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। সেখানে আখের পরিবর্তে বিট থেকে চিনি উৎপাদনের চেষ্টা করা হবে। আখ উৎপাদনের জন্য জমি প্রায় সারা বছর ধরে ব্যবহার করতে হয়, অথচ চিনিকল চলে মূলত কয়েক মাস। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও জমির সীমাবদ্ধতার কারণে এভাবে জমি ব্যবহার করা অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা টেকসই নয়। বিটের ক্ষেত্রে সময় কম লাগে, একই জমিতে বছরে আরেকটি ফসল করার সুযোগ থাকে। প্রকল্পটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্য চিনিকলেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে।

প্রশ্ন

আপনি পাট খাতকে বর্তমান প্রায় এক বিলিয়ন ডলার থেকে পাঁচ থেকে সাত বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য দিয়েছেন। কীভাবে করবেন?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: আমরা বছরে যত লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদন করি, কয়েক বছর ধরে তা এক জায়গাতেই আছে। এর একটি অংশ কাঁচা পাট হিসেবে ভারতে বা অন্য দেশে রপ্তানি হতো। পরে সেই পাটে মূল্য সংযোজনের পর বেশি দামে বিক্রি করত তারা। কাঁচা পাট রপ্তানি এখন পুরোপুরি বন্ধ। আগামী দিনে স্লাইভার (স্লাইভার হচ্ছে সুতা তৈরির আগের একটি ধাপ) রপ্তানিও বন্ধ করে দেওয়া হবে।

আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল্য সংযোজিত পাটপণ্য রপ্তানি করা। এ জন্য একটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সম্ভব হলে একটি যৌথ গবেষণাগারও স্থাপন করা হবে। পাটের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি চাই উন্নত মানের বীজের মাধ্যমে। বীজ ভালো হলে একই জমিতে উৎপাদন বাড়বে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। তখন কৃষকেরও পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে।

প্রশ্ন

ভারত ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক রেখেছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সমাধান না হলে বাংলাদেশ কি ডব্লিউটিওর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় যাবে?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: ডব্লিউটিওর বড় দুর্বলতা হচ্ছে এর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা মূলত দুই স্তরের। কোনো সদস্যদেশ অভিযোগ করলে প্রথমে একটি প্যানেল অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে রায় দেয়। রায়ের পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো আপিল করা। কিন্তু ডব্লিউটিওর আপিল ব্যবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরে কার্যকর নয়। আপিল বডির সদস্য নিয়োগ নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে এই ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে ডব্লিউটিওতে মামলা করে প্রথম ধাপে রায় পাওয়া গেলেও পরবর্তী আপিলের সুযোগ কার্যকরভাবে না থাকায় বিষয়টি জটিল হয়ে যায়। আমাদের দেখতে হবে, মামলা করলে কী ফল পাওয়া যেতে পারে এবং সেই ফল বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা যাবে।

প্রশ্ন

সম্প্রতি সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলো। এর আগে বাজার থেকে তেল প্রায় উধাও হয়ে গেল। দাম বাড়ানোর পরে সব তেল বাজারে ফিরে এল। এর ব্যাখ্যা কী?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: সরকার সয়াবিন ছাড়া কোনো পণ্যের দাম সরাসরি নির্ধারণ করে না। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণের বিষয়টিও সরকারের হাতে রাখা ঠিক হয়নি। এটি আগেই বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। এর জন্য প্রায় প্রতি মাসে বৈঠক করতে হয়। ওদিকে ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন লোকসানে ব্যবসা করছেন তাঁরা এবং এভাবে চলতে থাকলে কেউ আমদানি করবেন না। তাঁদের এই বক্তব্যের পেছনে কিছুটা বাস্তবতা আছে, তা আমাকে স্বীকার করতেই হবে।

প্রশ্ন

নিত্যপণ্যের বাজারে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর সমাধান নিয়ে কী ভাবছেন?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: একেক ধরনের ব্যবসার প্রকৃতি একেক রকম। কিছু আমদানি পণ্যের বৈশিষ্ট্যই এমন যে বড় পুঁজি ছাড়া করা কঠিন। যেমন একটি জাহাজে ১২ হাজার টন চিনি আসে। এত বড় পুঁজি সবার পক্ষে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। আবার একজন ব্যবসায়ী শুধু এক জাহাজ চিনি আমদানি করেই বসে থাকবেন না। তাঁকে নিয়মিত পুঁজি ঘুরিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যেতে হবে।

আমাদের কাজ কতজন ব্যবসা করছেন তা দেখা নয়, তাঁরা বাজারে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন কি না, তা–ও পর্যবেক্ষণ করা। সেটি করা সম্ভব। আগামী দিনে বাজার পর্যবেক্ষণের পুরো ব্যবস্থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর করার পরিকল্পনা করছি। আবার কৃষিপণ্যকে সংবেদনশীল তালিকায় রেখেছি, সেগুলোর ক্ষেত্রে মৌসুমি ব্যবধানের কারণে যাতে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি না হয়, সেটিও নজরদারিতে থাকবে। কৃষি মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার অনুরোধ করেছি। কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা একটি প্রকল্প নেবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে সারা বছর বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য কখন কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা আগেই বোঝা যাবে।

আগামী দিনে টিসিবির আমদানি করা কিছু পণ্য বাজারদরেই বাজারে ছাড়া হবে। কম আয়ের মানুষের জন্য বর্তমানে যে কর্মসূচি চলছে, সেটিও বহাল থাকবে। এর বাইরে কিছু পণ্য বাজারদরে বিক্রি করা হবে, যাতে বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকে। এই আমদানিপ্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে চাই। বেসরকারি খাতের ২০, ৫০ বা ১০০ জন ব্যবসায়ী যদি টিসিবির সঙ্গে মিলে আমদানি করতে চান, তাঁরা অংশীদার হিসেবে যুক্ত হতে পারবেন।

প্রশ্ন

পাঁচ বছর পর আপনার তিন মন্ত্রণালয়ের সাফল্য কোন তিনটি পরিমাপযোগ্য সূচক দিয়ে বিচার করতে চান?

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: পাটের ক্ষেত্রে একটি যৌথ গবেষণাগার করতে চাই। সেখানে পাটের উৎপাদনশীলতা, নতুন পাটজাত পণ্য, মূল্য সংযোজন ও বাজার নিয়ে গবেষণা হবে। চীনের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারকের জন্য যোগাযোগ করেছি। আরেকটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। দেশে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টন পাটবীজ প্রয়োজন। আমরা উৎপাদন করি মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টনের মতো। পাটজাত পণ্য ও হস্তশিল্পের নকশা উন্নয়নের জন্য একটি দক্ষতা কেন্দ্র করতে চাই। আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এটি পরিচালনা করা যেতে পারে।

আর টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটগুলোর পাঠ্যক্রম আধুনিক করা হবে। চীনের একটি পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করার উদ্যোগ রয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য চীনে পাঠানো এবং সেখান থেকে শিক্ষক এনে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে। শিল্পে কোনো প্রক্রিয়াগত সমস্যা হলে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইনস্টিটিউট সেটির সমাধান নিয়ে গবেষণা করবে। চীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয় দুই থেকে চার হাজার কারখানার সঙ্গে কাজ করে। আমাদেরও এমন ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো বাস্তবিক অর্থে প্রয়োজনীয় নয় বা পর্যাপ্ত ফল দিচ্ছে না। সেগুলোর কিছু বন্ধ বা একীভূত করে সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।

আমরা এমন শিল্পে গুরুত্ব দিতে চাই, যেখানে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনেক কারখানাও পুরোনো। এগুলোর অনেক জমি বড়, কিন্তু বিনিয়োগ হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তখন যে ধরনের শিল্পকাঠামো দরকার ছিল, এখন তা একইভাবে কার্যকর নয়। তাই নতুন বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থানের জন্য এসব সম্পদ ব্যবহার করতে হবে। বেসরকারি খাতের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর আগ্রহ আছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আগ্রহী বিনিয়োগকারী পাওয়া যাচ্ছে। স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে তাঁদের সুযোগ দেওয়া হবে।

প্রশ্ন

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির: আপনাকেও ধন্যবাদ।