অভিমত

ব্যাংকের গতি ফেরাতে পারে সুশাসন

আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আর্থিক খাতের টেকসই রূপান্তরে ব্যাংক খাতের ভূমিকা সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগের অবস্থান বেশ উদ্বেগজনক। কিছু ব্যাংকের অবস্থা অবশ্য ভালো। যা–ই হোক, অর্থনৈতিক বিকাশ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসব ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা পূরণে ব্যাংকগুলো সফল হতে পারেনি, অধিকাংশ ব্যাংক এখন চরম রুগ্​ণ ও সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে ঢালাও সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রতিটি ব্যাংকের আলাদা মূল্যায়ন, পর্ষদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং সেবার বিকাশ ঘটানো এখন সময়ের বড় দাবি। 

বাস্তবে যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তার অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা, পেশাদার পরিচালনা সক্ষমতা এবং অর্পিত দায়দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের যোগ্যতার ওপর। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার মাশুল আজ পুরো খাতকে দিতে হচ্ছে। অধিকাংশ ব্যাংকই আজ অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। 

বছরের পর বছর এসব ব্যাংককে রুগ্​ণ অবস্থায় ফেলে রাখলে দেশের পুরো আর্থিক সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করবে। বর্তমানে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলছে। 

কিন্তু এখানে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা অন্যতম প্রধান বিষয়। সীমিত সরকারি তহবিল দিয়ে এতগুলো খেলাপি ঋণে ভারাক্রান্ত রুগ্​ণ ব্যাংককে মূলধন পুনঃসরবরাহ করে টিকিয়ে রাখা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ঢালাওভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রতিটি ব্যাংকের বাস্তব অবস্থা সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন করতে হবে। যেসব ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে, সেগুলোর জন্য দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আর যেসব ব্যাংক পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়, সেগুলো বন্ধ বা একীভূত করার স্পষ্ট ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

যেকোনো ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রধান ও অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। পর্ষদ পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কঠোরভাবে আদায় এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো ব্যাংকই নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। সুশাসন নিশ্চিত করে ব্যাংকগুলোকে যদি একবার নিজ পায়ে দাঁড় করানো যায়, তবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে তারা অর্থনীতিতে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারবে। 

এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজে আর্থিক সেবার আওতায় আনা সম্ভব। শুধু ঋণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাংকারদের সেবার পরিধিও বাড়াতে হবে। নগদবিহীন (ক্যাশলেস) লেনদেন জোরদার করা, ব্যাংকাসুরেন্সের মতো নতুন বিমা সেবা চালু করা এবং খরচ কমিয়ে দ্রুততম সময়ে সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপব্যবহার না হলে প্রযুক্তিভিত্তিক এসব আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকগুলোর কার্যক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

● লেখক: সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক