মো: আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর
মো: আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর

রাজস্ব খাতের রোগ, কারণ ও প্রতিকার কী

যেকোনো রোগের সুচিকিৎসার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগের সঠিক কারণ নির্ণয়। কারণ নির্ণয়ের পর সঠিক চিকিৎসা হলে রোগ নিরাময় হয়। বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিগত সময়ে রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করা হয়নি। ফলে ভুল চিকিৎসা হয়েছে।

ভ্যাট চালু করার পর ৩৫ বছর ধরে রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কারে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ ফলাফল হলো কর-জিডিপি অনুপাত সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন, ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ভারতে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১২ শতাংশ, পাকিস্তানে প্রায় ১৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১৭ শতাংশ এবং নেপালে প্রায় ১৯ শতাংশ। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর গড় প্রায় ১৯ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে ৩০-৩৫ শতাংশের কাছাকাছি। সর্বোচ্চ কর-জিডিপি অনুপাত ডেনমার্কে ৪৫ শতাংশ।

মূল সমস্যা কর ফাঁকি

বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের মূল সমস্যা হলো ব্যাপক কর ফাঁকি। এযাবৎ এই রোগের যেসব কারণ নির্ণয় করা হয়েছে তা সঠিক ছিল না।

আমদানি পর্যায়ে কর ফাঁকি হয় মূলত পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন করে এবং মূল্য কম প্রদর্শন করে। যে শ্রেণিবিন্যাসে শুল্ক-করের হার কম, কৌশলে সেদিকে শ্রেণিবিন্যাস করা হয় এবং মূল্য কম প্রদর্শন করা হয়। ফলে রাজস্বের পরিমাণ কমে যায়।

স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট এবং আয়কর উভয় ক্ষেত্রে কর ফাঁকি হয় মূলত বিক্রির পরিমাণ গোপন করে। মাসের শেষে ভ্যাট প্রদান করা হয় সরাসরি বিক্রির পরিমাণের ওপর। বিক্রির পরিমাণ কম দেখানো হলে ভ্যাটের পরিমাণ কমে যায়। বিক্রি থেকেই আয় হয়। বিক্রি কম দেখানো হলে আয় কমে যায়। বছর শেষে আয়কর কম পরিশোধ করতে হয়। ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়ার মূল পন্থা হলো বিক্রির পরিমাণ গোপন করা।

ক্রয়-বিক্রয়ের একমাত্র প্রামাণিক দলিল হলো চালানপত্র বা ইনভয়েস। চালানপত্র সঠিক হলে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হয়ে যায়—ভ্যাট ও আয়করের পরিমাণ সঠিক হয়ে যায়।

বিক্রি কম দেখানোর কৌশল কী কী

বিক্রির সঠিক পরিমাণ হিসাবে প্রদর্শন না করার কৌশলগুলো হলো—বিক্রয়মূল্য নগদে গ্রহণ করে এবং ক্রয়মূল্য নগদে প্রদান করে হিসাবে ক্রয়-বিক্রয় লিপিবদ্ধ না করা, বিক্রির বিপরীতে ভ্যাট চালানপত্র জারি না করা, ভ্যাট চালানপত্র জারি করা হলেও তা চূড়ান্ত হিসাবে অন্তর্ভুক্ত না করা, জাল চালানপত্র জারি করা, কাঁচা চালানপত্র বা ডেলিভারি চালানপত্র ব্যবহার করে সরবরাহ করা, একটা চালানপত্র একাধিকবার ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করা ইত্যাদি।

একজনের বিক্রয় আরেকজনের ক্রয়। উভয় ক্ষেত্রেই ভ্যাট এবং আয়কর ফাঁকি হয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো, মাস শেষে কত টাকা ভ্যাট দিতে চায়, বছর শেষে কত টাকা আয়কর দিতে চায় তা ঠিক করে সেভাবে হিসাবপত্র প্রস্তুত করা হয়। খুব কম প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে যারা এই চক্রের বাইরে, অর্থাৎ সঠিক ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ হিসাবে প্রদর্শন করে এবং সেই ভিত্তিতে ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ করে। ক্রয়-বিক্রয়ের একমাত্র প্রামাণিক দলিল হলো চালানপত্র বা ইনভয়েস। চালানপত্র সঠিক হলে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হয়ে যায়—ভ্যাট ও আয়করের পরিমাণ সঠিক হয়ে যায়।

রাজস্বের হিস্যা

সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ আহরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের আহরিত মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ আহরিত হয় স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক এবং আবগারি কর থেকে; প্রায় ৩৫ শতাংশ আহরিত হয় আয়কর থেকে; প্রায় ২৭ শতাংশ আহরিত হয় আমদানি পর্যায়ে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে। অর্থাৎ স্থানীয় ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি কর ও আয়কর হলো এনবিআরের মোট রাজস্বের প্রায় ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ রাজস্বের ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়ার মূল অপকৌশল হলো সঠিকভাবে ইনভয়েস জারি না করা। এই হলো কর ফাঁকির মূল কারণ। প্রতিটি ক্রয়-বিক্রয়ের বিপরীতে যথাযথ ইনভয়েস জারি করাই হলো এর একমাত্র প্রতিকার। অন্যান্য সব পদক্ষেপ গৌণ।

সঠিক চিকিৎসা হলে রোগ নিরাময় হয়। বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিগত সময়ে রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করা হয়নি। ফলে ভুল চিকিৎসা হয়েছে।

গতানুগতিক সংস্কারের ব্যর্থতা

এযাবৎ কর ফাঁকির মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়নি—ভুল প্রতিকার দেওয়া হয়েছে। কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) এবং ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) একীভূত করতে বলা হয়। কর অব্যাহতি বাতিল করে এবং অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত করে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে বলা হয়। একক কর হার প্রবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব প্রতিষ্ঠানের দাখিলপত্র পেশ নিশ্চিত করতে বলা হয়। কর নীতি এবং বাস্তবায়ন আলাদা করার ওপর জোর তাগিদ দেওয়া হয়।

এসব পদক্ষেপ কি করদাতার সঠিক পরিমাণ বিক্রয় তথ্য জানতে সহায়ক হবে? উত্তর হলো—না। কর ফাঁকির প্রকৃত কারণ—বিক্রয় তথ্য গোপন করার সঙ্গে এই পদক্ষেপগুলোর কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। যোগসূত্র রয়েছে কর চালানপত্রের।

ক্রয়-বিক্রয় অর্থাৎ চালানপত্রকেন্দ্রিক সংস্কার

ক্রয়-বিক্রয়ের মূল দলিল চালানপত্র। যদি সব বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ চালানপত্র জারি করা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরকারের ৭৩ শতাংশ রাজস্বের ক্ষেত্রে ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে প্রায় ৪৩ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভ্যাট নেটের বাইরে রয়েছে।

আবার ভ্যাট প্রযোজ্য থাকলেও প্রায় সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি ভিত্তি থেকে ভ্যাট ফাঁকি হয়ে যায়। অর্থাৎ সব ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইনভয়েস জারি করা সম্ভব হলে ভ্যাট আহরণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আয়কর আহরণ বৃদ্ধিতেও ইনভয়েস অটোমেশন ব্যাপক অবদান রাখবে। করদাতার প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ জানার উদ্দেশ্যে যেকোনো পদক্ষেপ হলো রাজস্ব খাতের মৌলিক সংস্কার। সব ক্রয়-বিক্রয়ের বিপরীতে চালানপত্র জারি এবং তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই এর একমাত্র সমাধান। কাঠামোগত, সাংগঠনিক এবং অন্য কোনো পদক্ষেপ মুখ্য নয়।

জাতীয় ইনভয়েস অটোমেশন সিস্টেম নির্মাণ

এমন একটা ইনভয়েস অটোমেশন সিস্টেম স্থাপন করা দরকার, যার মাধ্যমে সারা দেশের সব ক্রয়-বিক্রয়ের ইনভয়েস সব ডিভাইস থেকে সহজে, এক ফরম্যাটে প্রস্তুত, জারি ও তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। কোনো কাঁচা চালান, পাকা চালান, রসিদ, মেমো, ডেলিভারি চালান ইত্যাদি থাকবে না।

ডেডিকেটেড নেটওয়ার্ক, হাই স্পিড ইন্টারনেট, সব ডিভাইসে ব্যবহার সহজ এমন সফটওয়্যার দিয়ে ছোট দোকান থেকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই যেন সহজে, অটোমেডেট সিস্টেম থেকে, ইনভয়েস জারি করতে পারে—সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সচেতনতা সৃষ্টি এবং উৎসাহ স্কিম চালু করা দরকার। দেশীয় অর্থ, মানবসম্পদ এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এমন সিস্টেম তৈরি করা যায়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)–এর এমন কাজ করার যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।

শেষ কথা

আমাদের দেশে রাজস্ব আহরণের ব্যয়ও কম। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আহরণে আমাদের দেশে মাত্র ২১ পয়সা ব্যয় হয়। ভারতে ৬০ পয়সা, পাকিস্তানে ৬৩ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৭১ পয়সা, জাপানে ১ দশমিক ৭০ টাকা ব্যয় হয়। তাই রাজস্ব খাতে বিনিয়োগ করা দরকার।

বর্তমান কর অব্যাহতি এবং কর ফাঁকি বিবেচনায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে দুই লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আহরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজস্ব খাতের রোগ অর্থাৎ কর ফাঁকির মূল কারণ হলো ক্রয়-বিক্রয়ের সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নেই।

গতানুগতিক সংস্কার নয়—এর একমাত্র প্রতিকার হলো দেশব্যাপী ব্যাপকভিত্তিক কার্যকর ইনভয়েস অটোমেশন করা, যা আমাদের দেশে রাজস্ব আহরণে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে। অর্থ, মানবসম্পদ এবং প্রযুক্তি দেশেই রয়েছে—প্রয়োজন হলো সিদ্ধান্ত এবং উদ্যোগ।

লেখক– মো. আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম