রেহানা আক্তার
রেহানা আক্তার

অভিমত: রেহানা আক্তার

ছোট উদ্যোক্তারা নিঃস্ব হতে বসেছে, টিকে থাকাই এখন লড়াই

আমার প্রতিষ্ঠানে হাতে তৈরি সিরামিক পণ্য বানানো হয়। সেই পণ্য পোড়ানোর জন্য গ্যাস আবশ্যক। আমি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজের উদ্যোগকে টেনে এনেছি। মাটির সিরামিক পণ্য তৈরিতে আমাদের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে। সর্বশেষ গত জুনে চীন থেকে প্রায় দুই বছরের বড় রপ্তানি আদেশ পেয়েছি। কিন্তু গ্যাসের তীব্র সংকটে আমার কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ব্যবসা পরিচালনা তো দূরের কথা, ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে গেছে।

আমাদের ছোট কারখানায় দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ পিস পণ্য তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হয় ফায়ারিং বা পোড়ানোর ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের পর থেকে লাইনের গ্যাসের চাপ একেবারে নেই বললেই চলে। বিকল্প হিসেবে আমি পাম্প থেকে গ্যাস কিনে এনে ব্যবহার করি। এই ব্যবস্থা চালু করতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে সেই সিএনজিও ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছিল না। পাম্পগুলোতে প্রেশার কম থাকে। বড় শিল্প পাওয়ার পরে যদি একটু বাঁচত, সেটা আমাদের দিত। গত কিছুদিন হয় গ্যাসের সরবরাহ একেবারেই বন্ধ। এমনকি ১ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েও আমরা গ্যাস পাচ্ছি না।

গত প্রায় ছয় মাস আমার কারখানায় ফায়ারিং কার্যত বন্ধ রয়েছে। যেটুকু মালামাল ছিল তা বিক্রি করে এবং ব্যাংকের ডিপোজিট ভেঙে এতদিন কর্মচারীদের বেতন দিয়েছি। কিন্তু এখন আর নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো কোনো আর্থিক সংগতি নেই। ব্যাংকঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হচ্ছে, অথচ আয় শূন্য। বাধ্য হয়ে কয়েক দিন আগে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত করা ১৩ জন অভিজ্ঞ কর্মচারীকে বিদায় দিতে হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) হলো একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু গ্যাসের মতো মৌলিক পরিষেবার সংকটে আজ আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তারা নিঃস্ব হতে বসেছে। একটি উদ্যোগ দাঁড় করাতে বছরের পর বছর ঘাম ঝরাতে হয়। অথচ নীতি সহায়তার অভাবে তা বন্ধ হতে এক সেকেন্ডও লাগে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে টিকে থাকার জন্য যদি ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সুবিধা কিংবা কোনো বিশেষ তহবিল না দেওয়া হয়, তবে এই শিল্প রক্ষা করা অসম্ভব।

উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) স্থানান্তরিত হতে। কিন্তু একটি এসএমই শিল্পের পক্ষে হুট করে আরও ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা কীভাবে সম্ভব? নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে আদৌ কী ধারণা রাখেন?

বিদেশ থেকে পণ্যের ক্রয়াদেশ হাতে থাকা সত্ত্বেও শুধু গ্যাসের অভাবে যদি কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়, তবে এর চেয়ে বড় দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, রাস্তাঘাটের খোঁড়াখুঁড়ির চেয়েও এখন উদ্যোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখা এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

রেহানা আক্তার, স্বত্বাধিকারী, ক্লে ইমেজ।