
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্পের অভিযাত্রায় এক অনন্য নাম ‘হোন্ডা’। বিশ্ববিখ্যাত জাপানি এই ব্র্যান্ড বাংলাদেশে কেবল বাহন সরবরাহ করছে না, বরং স্থানীয়ভাবে উৎপাদন এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের শিল্পায়নে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, উচ্চ সিসির বাইকের সম্ভাবনা এবং আগামীর দুই চাকার ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান। সাক্ষাৎকারটি প্রথম আলোর অটোমাবাইল সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়। এরপর তা অনলাইনে প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ।
বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ডলার–সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে হোন্ডা কীভাবে তাদের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রাখছে? বর্তমান বাজার অবস্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান: বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ডলারের চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড একটি স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর মূল ভিত্তি হলো আমাদের ‘হোন্ডা দর্শন’। আমরা বিশ্বাস করি, ব্যবসা শুধু বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গতিশীলতা এনে মূল্য সংযোজনের একটি প্রক্রিয়া। আমাদের গ্রাহককেন্দ্রিক কৌশল, উন্নত মানের পণ্য, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিস্তৃত ডিলার নেটওয়ার্ক বাজারে একটি বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ, তাই আমরা যুবসমাজের চাহিদা ও স্টাইলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা আমাদের ব্র্যান্ড পজিশনিং নির্ধারণ করেছি, যা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আমাদের প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করেছে।
মোটরসাইকেলের পার্টস স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে আপনাদের অগ্রগতি কতটুকু? এখানে বাধা কোথায়?
শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান: আমাদের লক্ষ্য শুধু মোটরসাইকেল বিক্রয় নয়; বরং গ্রাহকের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সাশ্রয়ী, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা। আমাদের দর্শন হলো, ‘যেখানে চাহিদা, সেখানেই উৎপাদন’। ধাপে ধাপে আমরা স্থানীয় উৎপাদন বা লোকালাইজেশন বৃদ্ধি করছি। এতে উৎপাদন ব্যয় ও ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে। একটি শক্তিশালী পশ্চাৎ–সংযোগ শিল্প গড়ে উঠবে।
তবে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ এবং মানসম্মত কাঁচামালের প্রাপ্যতা ও নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। আমরা এরই মধ্যে মোটরসাইকেল রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছি, যা এই শিল্পের বিশাল সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে এটি দেশের অন্যতম রপ্তানি খাত হয়ে উঠবে।
সরকার ৩৫০ সিসি পর্যন্ত অনুমতি দেওয়ার পর, হোন্ডার জনপ্রিয় হাই-সিসি বাইকগুলো আনার ব্যাপারে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান: হোন্ডার গ্লোবাল পোর্টফোলিওতে ৩৫০ সিসি ও তার ঊর্ধ্ব–সেগমেন্টে যুবসমাজের জন্য বেশ কিছু আকর্ষণীয় মডেল রয়েছে। বাংলাদেশে ৩৫০ সিসি পর্যন্ত অনুমোদন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। আমরা বাজারের চাহিদা, গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা এবং সার্ভিস প্রস্তুতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে আমাদের হাই-সিসি মডেলগুলো আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করব। আমাদের লক্ষ্য হবে প্রিমিয়াম রাইডিং অভিজ্ঞতার সঙ্গে শক্তিশালী আফটার সেলস সাপোর্ট নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে কি খুব শিগগির হোন্ডার ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল দেখার সম্ভাবনা আছে?
শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান: বিশ্বব্যাপী হোন্ডা কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে ইলেকট্রিফিকেশনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশেও ইলেকট্রিক মোটরসাইকেলের সম্ভাবনা প্রচুর। তবে চার্জিং অবকাঠামো, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সহায়তা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন বাজার পুরোপুরি প্রস্তুত হবে এবং আমরা গ্রাহকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট নিশ্চিত করতে পারব, তখনই আমরা ইভি নিয়ে আসব। আমাদের কাছে প্রযুক্তি মানেই গ্রাহকের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা।
সড়ক নিরাপত্তা ও চালকদের দক্ষ করে তুলতে হোন্ডার বিশেষ কোনো উদ্যোগ আছে কি?
শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান: সড়ক নিরাপত্তা হোন্ডার বৈশ্বিক অঙ্গীকার। আমরা বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ‘৪এস’ ডিলারশিপ কার্যক্রম চালু করেছি, যার একটি অপরিহার্য অংশ হলো ‘সেফটি রাইডিং’। আমরা নিয়মিত সারা দেশে সেফটি ট্রেনিং প্রোগ্রাম এবং স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করছি। বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সড়ক চিহ্ন ও ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে ধারণা দিতে আমরা বাংলাদেশে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, একটি নিরাপদ ও দক্ষ যুবসমাজই দেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।
আগামী ২০৩০ সালে দেশের মোটরসাইকেল শিল্পকে আপনি কোথায় দেখছেন? আপনাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?
শাহ মুহাম্মদ আশিকুর রহমান: ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্প হবে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং ডিজিটালি সংযুক্ত। স্মার্ট কানেকটিভিটি ও অধিক লোকালাইজেশন আগামী দিনের শিল্পকে নতুন মাত্রা দেবে। আমাদের লক্ষ্য হলো গ্রাহকের প্রথম পছন্দের ব্র্যান্ড হওয়া, শক্তিশালী বিক্রয়–পরবর্তী সেবার মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা, ইলেকট্রিফিকেশন ও স্মার্ট প্রযুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখা, যুবসমাজের স্বপ্ন ও গতির নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হওয়া। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেড দেশের মোটরসাইকেল শিল্পে একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।