মো: আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর
মো: আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর

নিবন্ধন বৃদ্ধি নাকি বিক্রির তথ্য: ভ্যাট সংস্কারের সঠিক পথ কোনটি

ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়িয়ে নয়, বিক্রির ইনভয়েসের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেই রাজস্ব ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন করা সম্ভব। ভ্যাট বাড়ানোর আসল পথটা আমরা কেন এখনো ধরতে পারছি না? ভ্যাট নিবন্ধন সংখ্যা বাড়িয়ে নয়, বিক্রির তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করলেই দেশের রাজস্বে যোগ হতে পারে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে নীতিনির্ধারকেরা এখনো যেন একধরনের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছেন। দেশে নানা বিষয় নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে যে রাজস্ব ব্যবস্থার মূল সমস্যা কোথায়, সেটা যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সামান্য একটা কাঠামোগত পরিবর্তন করলেই বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব যোগ হতে পারে।

চলুন, খুব সহজভাবে বিষয়টা দেখি। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন—করজাল বাড়াতে হবে, নিবন্ধন বাড়াতে হবে, এমন কথা খুব বলা হয়। আয়কর নিবন্ধন সংখ্যা বাড়ছে, ভ্যাট নিবন্ধন সংখ্যা বাড়ছে—এগুলো নিয়ে বেশ ঢাকঢোল পেটানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা কী?

আয়কর খাতে এখন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নিবন্ধন (টিআইএনধারী) রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৪৫ লাখের মতো। এর মধ্যেও বেশির ভাগই শূন্য রিটার্ন। মানে, কোনো করই দেন না। যাঁরা দেন, তাঁদের বড় অংশ ন্যূনতম কর দেন। সবশেষে দাঁড়ায়, প্রকৃত অর্থে কর দেন প্রায় ৫০ হাজার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

১ কোটি ২০ লাখ থেকে ৫০ হাজার! এই ব্যবধান কী বলে? এটাই বলে, নিবন্ধন বাড়ানো মানেই করদাতা বাড়ানো নয়। আজ যদি আয়কর নিবন্ধন বাড়িয়ে ৫ কোটিও করি, তাহলেও প্রকৃত করদাতার সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে খুব বেশি বাড়বে না। গত কয়েক বছরের তথ্য সেটাই প্রমাণ করে।

ভ্যাটের ক্ষেত্রেও একই গল্প—শুধু একটু বেশি নাটকীয়

এবার ভ্যাটের দিকে তাকাই। দেশে প্রায় ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে। শুনলে মনে হয়—চমৎকার! কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্য রকম। পুরো ভ্যাটের বেশির ভাগ আসে মাত্র ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান থেকে। আরও নির্দিষ্ট করে বলি—বৃহৎ করদাতা ইউনিটের মাত্র ১০৯টি প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রায় ৬০ শতাংশ ভ্যাট আসে। এ ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ হলো, দেশের শীর্ষ ৫ হাজার প্রতিষ্ঠানই প্রায় ৯৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়; অর্থাৎ ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধন থাকলেও আসল খেলোয়াড় ৫ হাজার।

নতুন নিবন্ধনের ‘শো’—কিন্তু ফলাফল কোথায়

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বড় করে ঘোষণা দিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, তার ফলাফল কী? এই নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কত প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছে? কত টাকা রাজস্ব এসেছে? আপনি কি কোথাও এই হিসাব দেখেছেন? অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, ফলাফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা নয়।

তাহলে আসল সমস্যা কোথায়

সমস্যা নিবন্ধনে নয়, সমস্যা হলো বিক্রির তথ্য গোপন করা। আপনি নিজেই ভাবুন, আপনি যখন দোকানে কিছু কিনতে যান, সব সময় কি ভ্যাট ইনভয়েস পান? অনেক সময়ই পান না। অনেক সময় আবার জাল বা ভুল ইনভয়েস দেওয়া হয়। এই যে ইনভয়েস ছাড়া বিক্রি, এই জায়গাই পুরো সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যে পরিমাণ ভ্যাট এখন আদায় হচ্ছে, তার প্রায় সমপরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে; অর্থাৎ আমরা ১ টাকা তুলছি আর ১ টাকা ফাঁকি চলে যাচ্ছে। এখন আপনি যদি শুধু এই ফাঁকি বন্ধ করতে পারেন, রাজস্ব আদায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

কোথায় ফোকাস করবেন, এটাই মূল প্রশ্ন

ধরুন, আমরা দেশের শীর্ষ ২০–২৫ হাজার প্রতিষ্ঠানের ইনভয়েস ঠিকভাবে রেকর্ড করতে পারলাম। তাহলে কী হবে? রাজস্ব প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অন্যদিকে যদি ২০–৩০ লাখ নতুন ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া হয়? তাহলে ভ্যাট ৫–১০ শতাংশের বেশি বাড়বে না। কারণ, নতুন যাঁরা আসবেন, তাঁদের ছোট ব্যবসা। এখন কোনো বড় ব্যবসা অনিবন্ধিত নেই। লাখ লাখ ছোট ব্যবসার ভ্যাট একত্র করেও ১ শতাংশ বাড়ানো কঠিন।

তাহলে সমাধান কী

সমাধান একটাই—ইনভয়েস অটোমেশন। মানে, প্রতিটি বিক্রির ইনভয়েস ডিজিটালভাবে রিয়েল টাইমে রেকর্ড করতে হবে। কেউ ইনভয়েস না দিয়ে বিক্রি করতে পারবে না। কেউ জাল ইনভয়েস ইস্যু করতে পারবে না। ভ্যাটযোগ্য, ভ্যাটমুক্ত দেশের সব ইনভয়েস এক ফরম্যাটে ইস্যু করতে হবে। ইনভয়েস ছাড়া কোনো লেনদেন নয়। মূল ফোকাস দিতে হবে ইনভয়েসের ওপর। দেশে ইনভয়েস বিপ্লব তৈরি করতে হবে। এটাই হলো মূল সমাধান।

অন্য দেশ কীভাবে করেছে

এবার একটু বাংলাদেশের বাইরে কী হয়, তা দেখি। আপনি হয়তো ভাবছেন, এই ইনভয়েস অটোমেশন, ডিজিটাল ইনভয়েস—এসব কি শুধু বইয়ের কথা? বাস্তবে কি কেউ এটা করে দেখিয়েছে? উত্তরটা খুব পরিষ্কার, হ্যাঁ, করেছে এবং সফলভাবে করেছে।

ব্রাজিল: শুরুটা যারা করেছিল

প্রথমে চলুন ব্রাজিলে যাই। ২০০৬ সালে তারা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়—সব ইনভয়েস ডিজিটাল করতে হবে। শুরুতে প্রতিরোধ ছিল, সন্দেহ ছিল, প্রশ্ন ছিল। কিন্তু তারা থামেনি। কয়েক বছরের মধ্যেই কী হলো জানেন? ভ্যাট ফাঁকি চোখে পড়ার মতো কমে গেল। রাজস্ব বাড়তে শুরু করল। এখন তাদের প্রায় সব লেনদেনই ডিজিটালভাবে রেকর্ড এবং ট্র্যাক করা হয়। মানে, আপনি যদি ব্রাজিলে কিছু বিক্রি করেন—সরকার সেটা জানে।

মেক্সিকো: সংখ্যা দিয়ে উত্তর দিয়েছে

এবার মেক্সিকোর কথা বলি। আমরা অনেক সময় বলি—এসব করলে কি সত্যিই রাজস্ব বাড়ে? মেক্সিকো সংখ্যায় উত্তর দিয়েছে। ই-ইনভয়েসিং চালুর পর ২০১১ থেকে ২০১৬—এই পাঁচ বছরে তাদের কর-জিডিপি অনুপাত ১২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে উঠে গেছে। একটু ভেবে দেখুন—এই বৃদ্ধি কত বড়! আর ভ্যাট সংগ্রহ? প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এটা কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, বাস্তব ফল।

ইতালি: ভ্যাট গ্যাপ কমানোর লড়াই

ইতালির সমস্যা ছিল আমাদের মতোই—ভ্যাট গ্যাপ। মানে, যা আদায় হওয়ার কথা, তার একটা বড় অংশ হারিয়ে যায়। তারা ২০১৯ সালে বাধ্যতামূলক ই-ইনভয়েসিং চালু করল। ফলাফল হলো, কয়েক বছরের মধ্যেই প্রায় ৭ বিলিয়ন ইউরো ভ্যাট গ্যাপ (ভ্যাট এড়ানো) কমাতে পেরেছে। এটা কোনো ছোট সংখ্যা নয়, এটা একটা অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিবর্তন।

ভারত: সবচেয়ে কাছের উদাহরণ

এবার আসি ভারতের কথায়। কারণ, আপনি হয়তো ভাবছেন, উন্নত দেশ তো অনেক কিছুই পারে, আমাদের মতো দেশে কি সম্ভব? ভারত করেছে। তারা এক দিনে করেনি—ধাপে ধাপে করেছে। প্রথমে বড় করদাতাদের জন্য চালু করেছে। তারপর ধীরে ধীরে মাঝারি, তারপর ছোট ব্যবসার দিকে গেছে। তবে ২০১৭ সালের ১ জুলাই জিএসটি চালু করার প্রথম দিন থেকে ভারত ই-ইনভয়েসিং চালু করেছে। ফলাফল হলো, জিএসটি সংগ্রহ বেড়েছে। কর ফাঁকি কমেছে। ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এসেছে।

কী শিখলাম

যদি শুধু ভ্যাট নিবন্ধন বাড়ানো হয়, তাহলে ফল খুব সীমিত। আর যদি বিক্রির ইনভয়েসের তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে ফল বহুগুণ। বিশ্ব যখন পথ দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা সেই পথ ধরব, নাকি পুরোনো ভুলেই আটকে থাকব? শুধু কি নিবন্ধন বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করব? অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তাহলে আরও ভোগান্তি রয়েছে!

কাজটি খুব কঠিন নয়

এটা কোনো রকেট সায়েন্স নয়। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি দিয়েই করা সম্ভব। খরচও খুব বেশি হবে না। কিন্তু করা হচ্ছে না। কেন করা হচ্ছে না—এটাই বড় প্রশ্ন। দেশে রাজস্ব সংস্কারের কথা প্রথমে বলে দাতা সংস্থা বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তারপর আমাদের নীতিনির্ধারক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ—সবাই সেই কথাই বলতে থাকেন। নিজেদের অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা, বিশ্লেষণ—এসব থেকে খুব কম সিদ্ধান্ত আসে।

শেষ কথা কী

ইনভয়েস অটোমেশন করলে ভ্যাট ঠিক হবে, আয়কর ঠিক হবে, ব্যবসার হিসাব ঠিক হবে। আবার দেশের অর্থনীতি স্বচ্ছ হবে, অনানুষ্ঠানিক খাত ক্রমে আনুষ্ঠানিক খাতে পরিণত হবে। একটি মাত্র উদ্যোগ, কিন্তু ফলাফল বহুমাত্রিক।

লেখক

মো. আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম ও ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট