
বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিং-২০২৪ এ স্থান করে নিয়েছে বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
করপোরেট ঋণনির্ভর ব্যাংক হওয়ার পরও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কীভাবে টেকসই ব্যাংকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। টেকসই খাতে আপনাদের ব্যাংক কেমন অর্থায়ন করেছে?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: আমাদের ব্যাংকের বড় একটি অংশ করপোরেট ঋণের ওপর নির্ভরশীল, এ কথা সত্য। তা সত্ত্বেও আমরা সব সময় সমান গুরুত্ব দিয়ে এসএমই, কৃষি, কুটির শিল্প ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থায়ন করে আসছি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি, যাতে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীও ব্যাংকিং সুবিধা পায়। টেকসই অর্থায়নের আওতায় আমরা সব ধরনের গ্রাহকের জন্য কার্যকর পণ্য ও সেবা চালু করেছি। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ন্যানো ঋণ—একটি স্বয়ংক্রিয়, সহজলভ্য ও কাগজবিহীন ঋণ। এর ফলে গ্রাহকের ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি বাস্তব উদাহরণ।
পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে আমরা বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড যানবাহন ক্রয়ে ঋণ প্রদান করি। তা ছাড়া এসএমই খাতে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে ঋণ দিয়ে থাকি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের অধীন বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করছি। সব মিলিয়ে শুধু করপোরেট নয়, সব স্তরে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছি, যার স্বীকৃতি হিসেবে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিংয়ে স্থান পেয়েছি। বলা যায়, টেকসই খাতের ঋণ ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও বড় অবদান রাখছে।
আপনাদের ব্যাংকের সেবা তো নানা মাধ্যমে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কী পরিমাণ মানুষ আপনাদের সেবা পাচ্ছেন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক সারা দেশে বহুমাত্রিক ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এমটিবিতে ১৩ লাখ ৬১ হাজার গ্রাহকের হিসাব রয়েছে। তার মধ্যে ঋণ হিসাব ৪৫ হাজার ১৬৫টি। আমাদের ডেবিট কার্ড ৩ লাখ ৭৯ হাজার এবং ক্রেডিট কার্ড ১ লাখ ৪৬ হাজার গ্রাহক ব্যবহার করেন। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করেন ১ লাখ ৫৯ হাজার গ্রাহক। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে এমটিবি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ গ্রাহকের হাতে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।
পরিবেশের ওপর আপনাদের উদ্যোগগুলোর প্রভাব কেমন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: নানা উদ্যোগ আমাদের ব্যাংকিং সেবাকে আরও আধুনিক, সহজ ও টেকসই করে তুলেছে। ডিজিটাল সেবার বিস্তারে গ্রাহকদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমেছে। এতে গ্রাহক সন্তুষ্টি যেমন বেড়েছে, তেমনি ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে মানুষের আরও কাছে। পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম, যেমন সৌরবিদ্যুৎ–চালিত শাখা, কাগজবিহীন ব্যাংকিং, ই-স্টেটমেন্ট, জ্বালানি ও পানি-সাশ্রয়ী অফিস পরিচালনা—এসবই আমাদের পরিবেশ সচেতনতা এবং পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু করি, যেখানে আমাদের কর্মীরা নিজেরাই অংশ নেন এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী উপহার দেন। এ ছাড়া আমরা গ্রাহকদেরও পরিবেশবান্ধব ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে উৎসাহিত করি, যা ভবিষ্যতের টেকসই ব্যাংকিং নিশ্চিত করে।
স্কুলশিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল উপহার দিয়ে থাকেন আপনারা। এমটিবির সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) উদ্যোগগুলোর প্রভাব সমাজে কেমন পড়েছে?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: স্কুলশিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল উপহার দিয়ে থাকেন আপনারা। এমটিবির সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) উদ্যোগগুলোর প্রভাব সমাজে কেমন পড়েছে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: স্কুলশিক্ষার্থীদের সাইকেল উপহার দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা তাদের স্কুলে যাতায়াতকে সহজ করে দিয়েছি, যা শিক্ষার্থীদের স্কুল উপস্থিতি বাড়াতে এবং ঝরে পড়া কমাতে সহায়তা করছে। আমাদের সিএসআর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি খাতে আমরা নিয়মিত সিএসআর তহবিল ব্যয় করছি। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণের মাধ্যমে আমরা জলবায়ু সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছি। দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল ব্যাগ বিতরণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা (বিশেষত স্কুলে) এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজিত কৃষি প্রশিক্ষণ—এসবই আমাদের সমাজবান্ধব ব্যাংকিংয়ের দৃষ্টান্ত। সব মিলিয়ে এমটিবির সিএসআর কার্যক্রম সমাজে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলছে মানবিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে।