এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দুটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাওয়া গেল। দুই রিপোর্টে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির যেমন বর্ণনা আছে, তেমনি আছে আগামী অর্থবছরগুলোর পূর্বাভাসও। কোনো মূল্যায়নই স্বস্তিদায়ক নয়, নিকট ভবিষ্যতে ভালো হবে, সে আশাও জোগায় না। যেমন তারা বলছে প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়বে। এর অর্থ হলো মানুষ আরও গরিব হবে, মধ্যবিত্তের টিকে থাকা কঠিন হবে, বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান হবে না, ব্যবসা-বাণিজ্যে থাকবে মন্দা, মানুষের প্রকৃত আয়ও বাড়বে না।
আমরা জানি, গত সাত বছরে করোনা মহামারি, সরবরাহব্যবস্থার সংকট, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বাধার মতো নানা ধাক্কা সামলেছে বিশ্ব অর্থনীতি। এত কিছুর পরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিন্তু পুরোপুরি থেমে যায়নি। অনেক দেশে কর্মসংস্থান টিকে আছে, আর্থিক ব্যবস্থাও বড় সংকট এড়িয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি আগের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নেমেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে ঠিক এ কথাই বলা আছে।
বিএনপি সরকারের দায়িত্ব এখন দুই দাতা সংস্থার পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করা। এটা ঠিক যে অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে সময় চেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ তখনই সময় দিতে রাজি, যখন দেখবে সরকার সত্যিকার অর্থে কার্যকর নীতি গ্রহণ করেছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই উল্টো চিত্র দেখছি।
তাহলে বাংলাদেশ কেন ভালো করা দেশের তালিকায় নেই। দেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হয়েছে ২০২২ সালের পর থেকে। এর জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের বিদায়ের পরে ২০২৪ সালে এসে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পতন ঠেকিয়েছে; কিন্তু বর্তমান সরকার এসেছে পাঁচ বছরের জন্য। পতন ঠেকানোই তার একমাত্র কাজ না। মানুষ উত্তরণ দেখতে চাইছে; অথচ পূর্বাভাস বলছে, অর্থনীতির আরও পতন ঘটবে।
বিএনপি সরকারের দায়িত্ব এখন দুই দাতা সংস্থার পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করা। এটা ঠিক যে অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে সময় চেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ তখনই সময় দিতে রাজি, যখন দেখবে সরকার সত্যিকার অর্থে কার্যকর নীতি গ্রহণ করেছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই উল্টো চিত্র দেখছি। সরকারের আয় খুবই কম, অথচ ব্যয় কেবল বাড়িয়েই চলছে। কৃচ্ছ্রসাধন কেবল কাগজে-কলমে, বাস্তবে প্রায় উধাও। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হলো। প্রতিযোগিতা করে বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হলো। বড় বড় ভবন নির্মাণসহ বিশাল অঙ্কের টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকব্যবস্থা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণও নিচ্ছে সরকার। এই ঋণের বড় অংশ গেছে চলতি ব্যয়ে, উৎপাদন বাড়াবে এমন বিনিয়োগে নয়। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বাজারে সরকারের অর্থ-সরবরাহ বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। এখন যে মূল্যস্ফীতির হার বাড়ছে, এর জন্য বিশ্বব্যাংক সরকারের এই অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধিকেই মূলত দায়ী করেছে।
সরকার এখন দাতাদের দ্বারস্থ হয়েছে। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কার করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হচ্ছে, যেসব সংস্কার দেশের প্রয়োজনে নিজেদের উদ্যোগেই করা দরকার, তা দাতাদের চাপে করতে হয়; আর এই সুযোগে দাতারাও তাদের মতো করে বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। ফলে বিপাক বাড়ে।
নির্বাচনের আগে বিএনপি যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিল, তাতে কিন্তু অর্থনীতি নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। এই অংশের নামই ছিল ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’। তাতে বলা আছে, ক্ষমতায় গেলে তারা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে, গঠন করা হবে ব্যবসাসহায়ক পরিবেশের, থাকবে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, নিশ্চিত করা হবে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ, আর্থিক খাতের জন্য সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে, বিলুপ্ত হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, খেলাপি ঋণের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, অবসান ঘটবে গোপন চুক্তির।
ইশতেহারে সুন্দর একটা কথাও আছে। তা হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। অর্থাৎ অর্থনীতি হবে ‘অন্তর্ভুক্তমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত’। এর একটা উদ্যোগ হয়তো গভর্নর নিতে চাইলেন। তিনি বলেছেন, দেশের ব্যাংক খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা জনগণকেই ‘জরিমানা’ হিসেবে দিতে হবে; আর এই জরিমানা দিতে হবে আগামী ৫ থেকে ৮ বছর ধরে। এই যে লুটপাট হওয়া ব্যাংক বাঁচাতে সবাইকে অর্থ দিতে হবে, এটাই হবে সম্ভবত অন্তর্ভুক্তমূলক ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। অর্থাৎ লুটপাট করবেন প্রভাবশালীরা, সেই অর্থ আদায় করা হবে না, বারবার ছাড় দেওয়া হবে; কিন্তু সাধারণ জনগণ সেই অর্থ ‘অংশগ্রহণমূলক’ পদ্ধতিতে দিয়ে দেবে।
জনগণ কিন্তু জরিমানা দেবে না; বরং জনগণকে কোথায় কোথায় স্বস্তি দেওয়া যায়, সেটিই তারা জানতে চায়। আর সরকারকে সেটিই বলতে হবে। এটা ঠিক যে প্রায় আট মাস মোটেই দীর্ঘ সময় না। তবে মানুষ একটা ভালো শুরু দেখতে চায়। আশ্বস্ত হতে চায় যে আসলেই সরকারের সদিচ্ছা আছে।
সরকার এখন দাতাদের দ্বারস্থ হয়েছে। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কার করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হচ্ছে, যেসব সংস্কার দেশের প্রয়োজনে নিজেদের উদ্যোগেই করা দরকার, তা দাতাদের চাপে করতে হয়; আর এই সুযোগে দাতারাও তাদের মতো করে বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। ফলে বিপাক বাড়ে। যেমন ব্যাংক খাত সংস্কারের কথা নির্বাচনের ইশতেহারেই আছে। কর প্রশাসনের সংস্কারের কথাও বলা আছে; কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি তেমন নেই। আর নেই বলেই পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস চলে গেছে। সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইনেই বলা আছে—তিন মাসের অর্থনীতির মূল্যায়ন করে অর্থমন্ত্রীকে তা সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর এখন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিতে ব্যাংকক আছেন। সেখানে দাতাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা জানার সুযোগ ঘটছে। ফলে তুলনা করতে পারছেন বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন পথে।
শেষ কথা হচ্ছে, আইএমএফ গতকাল যে রিপোর্টটি প্রকাশ করল, তাতে শেষ অংশে প্রতিটি দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি অভিন্ন সুপারিশ আছে। আইএমএফ বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি সরকারের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দরকার।
সবারই প্রত্যাশা—ফিরে এসে অর্থনীতির একটি সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করে, উত্তরণের জন্য কী কী করতে হবে, তা তাঁরা জানাবেন। জনগণ কিন্তু জরিমানা দেবে না; বরং জনগণকে কোথায় কোথায় স্বস্তি দেওয়া যায়, সেটিই তারা জানতে চায়। আর সরকারকে সেটিই বলতে হবে। এটা ঠিক যে প্রায় আট মাস মোটেই দীর্ঘ সময় না। তবে মানুষ একটা ভালো শুরু দেখতে চায়। আশ্বস্ত হতে চায় যে আসলেই সরকারের সদিচ্ছা আছে।
শেষ কথা হচ্ছে, আইএমএফ গতকাল যে রিপোর্টটি প্রকাশ করল, তাতে শেষ অংশে প্রতিটি দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি অভিন্ন সুপারিশ আছে। আইএমএফ বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি সরকারের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দরকার। সুতরাং আপনারা বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দিন, জনগণ তাতে আস্থা রাখবে; আর তাতেই উত্তরণের দিকে যাবে অর্থনীতি।