ফারইস্ট লাইফের ৬৪৪ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ৬৪৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তদন্ত কর্মকর্তা শাহ মিনহাজ উদ্দিনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল হলে আজ বৃহস্পতিবার আদালত তা গ্রহণ করেন। এতে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. হেমায়েত উল্যাহসহ ২৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন। আদালত পরে মামলাটির তদন্তভার ডিবি পুলিশকে দেয়। তদন্তে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ৪০ লাখ গ্রাহক ও কয়েক হাজার কর্মকর্তা–কর্মচারীর দুর্ভোগের চিত্র উঠে আসে। এ জন্য দায়ী করা হয় কোম্পানির দুই সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও এম এ খালেক, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং সাবেক সিইও মো. হেমায়েত উল্যাহসহ ২৪ জনকে।

হাজতে থাকা অবস্থায় এম এ খালেক গত বছরের নভেম্বরে মারা গেছেন। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন এম এ খালেকের স্ত্রী সাবিহা খালেক, তাঁদের দুই ছেলে শাহরিয়ার খালেদ ও রুবাইয়াত খালেদ এবং মেয়ে শারওয়াত খালেদ। এ ছাড়া রয়েছেন সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী তাসলিমা ইসলাম ও স্ত্রীর ভাই সেলিম মাহমুদ এবং নজরুল ইসলামের দুই বন্ধু নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের দুই সহোদর মো. সোহেল খান ও মো. আজাহার খান।

এ ছাড়া মো. হেমায়েত উল্যাহসহ প্রতিষ্ঠানটির সাবেক সিইও একরামুল আমিন ও মো. আলী হোসেন এ মামলায় অভিযুক্ত। অন্য অভিযুক্তরা হলেন সাবেক ফারইস্ট লাইফের সাবেক ডিএমডি মো. জাহাঙ্গীর আলম মুন্সী, সাবেক অর্থ ও হিসাব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান খান, সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক যুগ্ম এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. কামাল হোসেন হাওলাদার, সাবেক কর্মকর্তা মাকবুল এলাহী এবং মো. আলমগীর কবির মুন্সি, সৈয়দ আব্দুল আজিজ, এ কে এম মনিরুল ইসলাম, মো. মিনহাজ উদ্দিন, মো. কাজী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, আসাদ খান ও মো. রহমত উল্যাহ দেওয়ান।

পুলিশের অভিযোগপত্র অনুযায়ী আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ও সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভুয়া চিঠি ও ভুয়া ভাউচার প্রস্তুত করেছেন। তাঁরা জাল-জালিয়াতি, বিশ্বাসভঙ্গ ও পর্ষদের অন্য পরিচালকদের কাছে তথ্য গোপন করে এ অর্থ আত্মসাৎ করেন। তাঁরা বিভিন্ন ব্যাংকে কোম্পানির বিনিয়োগ করা মোট ৬৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ে গেছেন। এ টাকার মধ্যে রয়েছে কোম্পানির নামে ৩৬ তোপখানা রোডে ভবন ও জমি কিনে সুকৌশলে ৪৫ কোটি টাকা এবং ৭২ কাকরাইলে ভবন ও জমি কিনে ১১৫ কোটি টাকা কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ও পরিচালক এম এ খালেক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে মিরপুর গোড়ান চটবাড়ী এলাকার জমির উন্নয়ন ব্যয় দেখিয়ে তাঁরা নিয়েছেন ৯২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আর এসব কারণে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং লাখ লাখ বিমা গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈধ পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ চক্রের বিরুদ্ধে এই মামলা ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আরও সাতটি মামলা দায়ের করেছে।

তদন্তকালে ১ নম্বর আসামি কারাগারে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় এবং ৫ নম্বর আসামি তানভীরুল হক ও ৬ নম্বর আসামি নূর মোহাম্মদ ডিকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

অভিযুক্তদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে কে এম খালেদ, এম এ খালেক, মিজানুর রহমান মোস্তফা, কামাল উদ্দিন, ম্যাকসনস মিথিলা টেক্সটাইল, মিথিলা প্রোপার্টিজ, পিএফআই প্রোপার্টিজ, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, পিএফআই সিকিউরিটিজ, প্রাইমএশিয়া ফাউন্ডেশন, আজাদ অটোমোবাইলস, মোল্লা এন্টারপ্রাইজ, (বিডি), প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ, প্রাইম ফাইন্যান্সিয়াল সিকিউরিটিজ, ম্যাকসনস অ্যাসোসিয়েটস এবং প্রাইম প্রোপার্টি হোল্ডিংস লিমিটেড।

সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও সাবেক সিইও হেয়ায়েতউল্যাহ বর্তমানে কারাগারে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম। বাড়িটির ঠিকানা ১১৫২২ মানাতি বে এলএন, ওয়েলিংটন, এফএল ৩৩৪৪৯। ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাড়িটি কেনা হয়েছিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩২৭ মার্কিন ডলার দিয়ে। বাড়ি কিনতে কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি, অর্থাৎ পুরো অর্থই একবারে পরিশোধ করা হয়। এ ছাড়া ছেলেমেয়ের নামে মো. নজরুল ইসলাম একই রাজ্যে গড়ে তুলেছেন তিনটি কোম্পানি।

জানতে চাইলে ফারইস্ট লাইফের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম আজ রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনিয়ম–দুর্নীতি করে জালিয়াত চক্র ফারইস্ট লাইফের অনেক ক্ষতি করেছেন। আমরা হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি আমরা চাই অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচার।’