আহসান জামান চৌধুরী
আহসান জামান চৌধুরী

সাক্ষাৎকার

কার্ডের আস্থা নিরাপত্তায়

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই যুগে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। গ্রাহকের জীবনযাত্রাকে সহজতর ও নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলো প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ও সেবার সমন্বয় ঘটাচ্ছে। কার্ডের আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, ট্রাস্ট ব্যাংকের কার্ড সেবার বিশেষত্ব ও ডিজিটাল পেমেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রতি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান জামান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মোহাম্মাদ মিরাজ

প্রশ্ন

ট্রাস্ট ব্যাংক কার্ডের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ওপর কেন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?

আহসান জামান চৌধুরী: বর্তমানের ডিজিটাল যুগে গ্রাহকের আস্থার প্রধান ভিত্তি হলো নিরাপত্তা। প্রতিনিয়ত সাইবার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় আমরা এনক্রিপশন ও মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কার্ডের অননুমোদিত ব্যবহার রোধে রিয়েল-টাইম ট্রানজেকশন অ্যালার্ট এবং উন্নত চিপ-প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। ফলে গ্রাহকেরা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে নিরাপদ বোধ করছেন। ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের সিস্টেম নিয়মিত আপডেট করা হয়।

প্রশ্ন

আপনাদের ব্যাংকের কার্ড সেবায় বিশেষ কোন কোন বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং কী সুবিধা রয়েছে?

আহসান জামান চৌধুরী: আমাদের কার্ডগুলো মূলত গ্রাহকের আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখে সাজানো। বিশেষ করে আমাদের ভিসা সিগনেচার প্লাস, সিগনেচার ও প্লাটিনাম কার্ডগুলোতে রয়েছে বেশ কিছু আকর্ষণীয় সুবিধা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

লাউঞ্জ সুবিধা: ঢাকার বলাকা লাউঞ্জে সপরিবার প্রবেশের সুবিধা ছাড়াও ‘প্রায়োরিটি পাস’-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৩০০টির বেশি আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে আমাদের গ্রাহকদের প্রবেশাধিকার রয়েছে।

লাইফস্টাইল ও ডাইনিং: দেশের শীর্ষস্থানীয় ফাইভ স্টার হোটেল ও নামীদামি রেস্টুরেন্টগুলোতে বছরজুড়ে একটি কিনলে একটি ফ্রি বা ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ (বোগো) অফার।

যাতায়াত ও ভ্রমণ: বিদেশভ্রমণের জন্য এয়ারপোর্টে যাতায়াতের সুবিধার্থে আছে ‘এয়ারপোর্ট পিক অ্যান্ড ড্রপ’ এবং বিমানবন্দরে ঝামেলামুক্ত ভ্রমণের জন্য বিশেষ ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা।

আর্থিক সুবিধা: প্রতিটি কেনাকাটায় রয়েছে রিওয়ার্ড পয়েন্ট সিস্টেম। এ ছাড়া ইলেকট্রনিকস, ফার্নিচার বা বড় কেনাকাটার ক্ষেত্রে জিরো পারসেন্ট সুদে সহজ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের (ইএমআই) সুবিধা।

প্রশ্ন

দেশে কার্ডের বাজার প্রবৃদ্ধি কি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সন্তোষজনক? আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আহসান জামান চৌধুরী: হ্যাঁ, বাংলাদেশে কার্ডের বাজারের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে অনলাইন লেনদেন বা ই-কমার্সে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির ফলে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন কয়েক গুণ বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় হয়তো শুরুটা একটু পরে হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটছে। বিশেষ করে সরকারের ‘বাংলা কিউআর’ ইনিশিয়েটিভ কার্ড পেমেন্টের ভবিষ্যতে একটি বড় বুস্ট হিসেবে কাজ করবে।

প্রশ্ন

ক্রেডিট কার্ডের সীমা নির্ধারণ এবং নতুন গ্রাহক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনারা কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেন?

আহসান জামান চৌধুরী: আমরা মূলত গ্রাহকের আয়, ক্রেডিট রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা যাচাই করি। তবে বর্তমানে আমরা ডাটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে গ্রাহকের চাহিদা বিশ্লেষণ করছি। ক্রেডিট লিমিট নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা ঋণ ও আয়ের অনুপাত (ডিবিআর) কঠোরভাবে মেনে চলি, যাতে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের জন্য ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা না হয়ে বরং একটি আর্থিক সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

প্রশ্ন

ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারে এমএফএস এবং কার্ডের মধ্যে সমন্বয় কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

আহসান জামান চৌধুরী: এটি অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে কিছু আন্তপরিচালন লেনদেন বিদ্যমান আছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত হবে। এমএফএস এবং কার্ড যদি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, তবেই প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কার্ডের উচ্চ নিরাপত্তা এবং এমএফএসের তৃণমূল পর্যায়ের সহজলভ্যতা—এ দুইয়ের সমন্বয়ই একটি শক্তিশালী ক্যাশলেস ইকোসিস্টেম গড়ে তুলবে।

প্রশ্ন

কারিগরি ত্রুটির ক্ষেত্রে গ্রাহকের ভোগান্তি নিরসনে আপনারা কী করছেন?

আহসান জামান চৌধুরী: গ্রাহকসেবাকে আরও গতিশীল করতে ‘স্বয়ংক্রিয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি’ নিয়ে কাজ করছি। যদি কোনো লেনদেন কারিগরি কারণে সফল না হয়, তবে আমাদের ২৪/৭ কল সেন্টার এবং স্মার্ট অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানাতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে আমরা অপেক্ষা না করে সিস্টেমের অসংগতি শনাক্ত করে প্রো-অ্যাকটিভলি গ্রাহকের রিফান্ড নিশ্চিত করি, যাতে তাঁকে কোনো ভোগান্তি পোহাতে না হয়।

প্রশ্ন

কার্ড গ্রাহকদের মধ্যে কোন ধরনের পেশার লোক বেশি? কোন ধরনের কেনাকাটায় তাঁরা বেশি খরচ করছেন?

আহসান জামান চৌধুরী: আমাদের গ্রাহকদের বড় একটি অংশ করপোরেট পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুযায়ী, তাঁরা এখন সবচেয়ে বেশি খরচ করছেন গ্রোসারি বা নিত্যপণ্যের কেনাকাটা, ই-কমার্স বা অনলাইন শপিং এবং দেশ-বিদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া বড় লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ও রেস্টুরেন্টে কার্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।