মাসরুর আরেফিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), সিটি ব্যাংক
মাসরুর আরেফিন,  ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), সিটি ব্যাংক

সিটি ব্যাংকের এমডি

এসব ঋণ শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, আর্থিকভাবেও নিরাপদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিংয়ে টানা পাঁচ বছর ধরে আছে বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সিটি ব্যাংক পিএলসি। টেকসই অর্থায়ন নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন

প্রশ্ন

টেকসই রেটিংয়ের তালিকায় থাকার অন্যতম শর্ত টেকসই অর্থায়ন সূচক। এই খাতে সিটি ব্যাংক কী পরিমাণ অর্থায়ন করেছে। এসব ঋণ কোন খাতে গেছে? 

মাসরুর আরেফিন: প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সিটি ব্যাংক পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের টেকসই উন্নয়নের যাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে আমরা বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ৩ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছি, যা আমাদের বিতরণ করা মোট মেয়াদি ঋণের ৩৪ শতাংশ। একই বছর আমাদের টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের ৮৮ শতাংশ। 

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সিটি ব্যাংক ২১৩ কোটি টাকার অর্থায়ন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১৩২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ। একই সঙ্গে আমরা অর্থায়ন করেছি দেশের সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে। এটির উৎপাদনক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াটের বেশি। এসব নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় পরিবেশ সুরক্ষায় আমরা ইটিপি (বর্জ্য পরিশোধনাগার) স্থাপন এবং পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ৫ শতাংশ সুদে এটিপি (বায়ু পরিশোধন প্রকল্প) স্থাপনে অর্থায়ন করেছি। ২০২৪ সালে সিটি ব্যাংক–বিকাশ ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পূর্ণ কাগজের ব্যবহারবিহীন ৮৫৫ কোটি টাকার অর্থায়ন করেছি।

”সিটি ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব ঋণে মন্দ ঋণের হার মাত্র ০.০০০২৪ শতাংশ এবং টেকসই ঋণে মন্দ ঋণের হার ০.০০০২৯ শতাংশ। এটা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
মাসরুর আরেফিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), সিটি ব্যাংক
প্রশ্ন

সিটি ব্যাংকের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করা ঋণের আদায় পরিস্থিতি কেমন? অন্য ঋণের চেয়ে এ ক্ষেত্রে ভিন্নতা কেমন?

মাসরুর আরেফিন: আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে দেওয়া ঋণের আদায় হার প্রচলিত ঋণের তুলনায় অনেক ভালো। কারণ, এসব প্রকল্পে অর্থায়নের আগে আমরা শুধু আর্থিক সূচক নয়; ঋণগ্রহীতার পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন–সংক্রান্ত সূচকগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিই। পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমরা একটি স্কোরশিটের মাধ্যমে প্রকল্পটির পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করি। এমনকি স্বল্প সুদে সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব ঋণ দেওয়ার সময় আমরা স্বতন্ত্র এনার্জি অডিটর দিয়ে প্রকল্পের নিরীক্ষা করিয়ে নিই। এই কঠোর যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে ঋণগ্রহীতারা যান, তাঁরা সাধারণত তাঁদের দায়বদ্ধতা বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকেন। ফলে ঋণখেলাপির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিটি ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব ঋণে মন্দ ঋণের হার মাত্র ০.০০০২৪ শতাংশ এবং টেকসই ঋণে মন্দ ঋণের হার ০.০০০২৯ শতাংশ। এটা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, টেকসই অর্থায়ন শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং আর্থিকভাবেও বেশি নিরাপদ ও স্থিতিশীল।

প্রশ্ন

টেকসই কোর ব্যাংকিংয়ে সিটি ব্যাংক কেমন করছে?

মাসরুর আরেফিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই রেটিং শুধু টেকসই বা পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল নয়। কোর ব্যাংকিং সূচকে শক্ত অবস্থানও এখানে অপরিহার্য। এদিক থেকে সিটি ব্যাংক উভয় সূচকে ভালো পারফর্ম করছে। আমরা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অর্থায়নের পাশাপাশি মূলধন পর্যাপ্ততা, রিটার্ন অন ইকুইটি, রিটার্ন অন অ্যাসেটস, মন্দ ঋণ অনুপাত, প্রভিশন কভারেজ এবং লিকুইডিটি কভারেজ অনুপাতসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছি। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আমাদের কর–পরবর্তী মুনাফা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। আর ইপিএস বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১ টাকায়। এমন ফলাফলই প্রমাণ করে, টেকসই ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি কোর ব্যাংকিংয়েও আমরা অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।

প্রশ্ন

বিকাশের গ্রাহকেরা এখন মুহূর্তে সিটি ব্যাংকের ঋণ পাচ্ছেন। কী পরিমাণ গ্রাহক এই সুবিধা পেয়েছেন। সামনে এ নিয়ে পরিকল্পনা কী? 

মাসরুর আরেফিন: ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ঋণ সুবিধা (ন্যানো লোন) ৬৭ লাখ বার নিয়েছেন ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি গ্রাহক। এখন পর্যন্ত ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এ মুহূর্তে প্রতিদিন আমরা বিকাশের ২৪ হাজার গ্রাহককে ১০ কোটি টাকার মতো ঋণ দিচ্ছি। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও সহজ ব্যবহারযোগ্যতার মাধ্যমে এই সেবা গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে। পরবর্তী পরিকল্পনা হচ্ছে নতুন পণ্য ভেরিয়েন্ট চালু করে দেশের আরও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এই সেবা পৌঁছে দেওয়া, যাতে সহজে ও দ্রুত ঋণ গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যায়।