মো. খোরশেদ আনোয়ার
মো. খোরশেদ আনোয়ার

মতামত

জীবনযাত্রা বদলে দিল কার্ড 

দেশে একসময় অধিকাংশ মানুষ নগদভিত্তিক লেনদেনকে বেশি পছন্দ করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে এই চিত্র। আমরা কার্ড ব্যবসাকে শুধু ব্যাংকিং সেবার সাধারণ অংশ হিসেবে দেখিনি, বরং একে আধুনিক জীবনযাত্রার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করছি। শপিং মল, সুপারশপ, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ট্রাভেল বুকিং বা ইউটিলিটি বিল পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই এখন কার্ডের অবাধ বিচরণ। এতে মানুষের মূল্যবান সময় সাশ্রয় হচ্ছে, নিরাপত্তা বাড়ছে এবং আর্থিক লেনদেনে এসেছে স্বচ্ছতা। কার্ড এখন আর শুধু টাকা পরিশোধের মাধ্যম নয়; এটি এখন সুবিধা, মর্যাদা এবং সর্বোপরি স্মার্ট জীবনযাত্রার প্রতীক।

বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য কার্ড স্বাচ্ছন্দ্যের মাধ্যম। বৈদেশিক লেনদেন–সংক্রান্ত বর্তমান নীতিমালাগুলো এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকেরা এখন দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রায় বৈধ সীমার মধ্যে নিরাপদে লেনদেন করতে পারছেন। পাসপোর্টে ট্রাভেল কোটা হিসেবে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত এন্ডোর্স করার সুবিধা থাকায় বিদেশে হোটেল বুকিং, এয়ার টিকিট ক্রয় থেকে শুরু করে এটিএম থেকে নগদ উত্তোলন এখন অনেক সহজ। এর ফলে নগদ ডলার বহনের ঝুঁকি ও ঝামেলা কমেছে। একই সঙ্গে গ্রাহকেরা ভ্রমণের আগে কার্ড সক্রিয়করণ, লিমিট ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার ট্র্যাক করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে পাসপোর্ট এন্ডোর্সমেন্ট প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করা গেলে গ্রাহকেরা আরও বেশি উপকৃত হবেন। এর ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে এবং কম কাগজপত্রের মাধ্যমে সহজেই এন্ডোর্স করা সম্ভব হবে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে ‘কন্টাক্টলেস’ বা ট্যাপ-অ্যান্ড-পে পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর ব্যবহার বাড়ছে; কারণ, এটি অত্যন্ত দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত। কার্ড সোয়াইপ বা ইনসার্ট না করে পস (পিওএস) মেশিনে শুধু ট্যাপ করলেই লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়। নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। প্রতিটি লেনদেনে ডাইনামিক এনক্রিপ্টেড ডেটা ব্যবহৃত হওয়ায় কার্ডের তথ্য চুরির ঝুঁকি থাকে না। তবে ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে পিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি তাৎক্ষণিক লেনদেনের এসএমএস ও ই-মেইল অ্যালার্ট গ্রাহককে সচেতন থাকতে সাহায্য করে।

দেশে ই-কমার্স খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটলেও কার্ড ব্যবহারের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। এ খাতে কার্ড লেনদেন বাড়াতে নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গ্রাহক পণ্য না পেলে বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য পেলে দ্রুত ও সহজ রিফান্ডের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নিরাপদ পেমেন্ট গেটওয়ে, টোকেনাইজেশন ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন আরও জোরদার করতে হবে। নীতিগতভাবে ব্যাংক, পেমেন্ট গেটওয়ে, মার্চেন্ট ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগই এই খাতে কার্ড ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে পারে।

গ্রাহকদের কাছে কার্ডকে আরও আকর্ষণীয় করতে রিওয়ার্ড প্রোগ্রাম একটি বড় ভূমিকা রাখে। ইবিএল সর্বদা গ্রাহকদের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ভ্যালু প্রপোজিশন তৈরি করেছে। গ্রাহকেরা তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয়ের মধ্য দিয়েই এখন বাস্তব সুবিধা উপভোগ করতে পারেন। কার্ড লেনদেনের বিপরীতে অর্জিত ‘স্কাইকয়েন’ দিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শপ, রেস্তোরাঁ ও হোটেলে ভাউচার এবং আকর্ষণীয় ছাড় উপভোগ করা যায়। ডেটা-ড্রিভেন পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক অফার দেওয়ায় এই স্কাইকয়েন গ্রাহকদের কাছে দারুণ সমাদৃত।

আগামী পাঁচ বছরে কার্ডের বাজার আরও বেশি ডিজিটাল, দ্রুত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে। ভার্চ্যুয়াল কার্ড, মোবাইল ওয়ালেট, ওয়্যারেবল পেমেন্ট এবং এআই-ভিত্তিক জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত প্রসার লাভ করবে। মোবাইল অ্যাপ থেকেই কার্ড চালু বা বন্ধ করা, লিমিট নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো গ্রাহকের হাতের মুঠোয় থাকবে। তবে নিকট ভবিষ্যতে প্লাস্টিক কার্ড পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, ব্যাকআপ পেমেন্ট এবং এটিএম ব্যবহারের জন্য ফিজিক্যাল কার্ডের ওপর নির্ভরতা থাকবে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ হবে ‘ফিজিক্যাল’ ও ‘ডিজিটাল’–এর অনন্য সহাবস্থান।

● লেখক: উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল)।