ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ব্যাংকের নারী ব্যাংকিং সেবা ‘আয়মা’। এই সেবার আওতায় একজন নারী গ্রাহক গাড়ি কেনার জন্য ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিতে পারবেন। অথবা গাড়ির মূল্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে।
এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। এ জন্য এই নারী গ্রাহকের ইউসিবি ব্যাংকের ‘আয়মা’ নারী ব্যাংকিং সেবার গ্রাহক থাকতে হবে। ইউসিবির ওয়েবসাইট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এই ঋণ নেওয়ার জন্য বেতনভুক্ত কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও স্বনিয়োজিত (সেলফ এমপ্লয়েড) নারী হতে হবে। সে জন্য বেতনভুক্ত নারীর ৫০ হাজার টাকা বেতন, চিকিৎসকের ৬০ হাজার টাকা, স্বনিয়োজিত ৬০ হাজার টাকা ও ব্যবসায়ী নারীর মাসে ৭৫ হাজার টাকা আয় থাকতে হবে।
এ ছাড়া ‘আয়মা’ নারী ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা চাইলে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা ঋণ নিতে পারবেন। আর জামানতবিহীন ঋণ নিতে পারবেন ৫০ লাখ টাকা। এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর।
এ জন্য নারী উদ্যোক্তাকে কমপক্ষে এক বছর ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। মূলত ব্যবসা সম্প্রসারণ মূলধন, কৃষি উৎপাদন ও বিপণন ও অন্যান্য বৈধ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এই ঋণ নেওয়া যাবে।
এই ঋণ নেওয়ার জন্য ব্যবসার বৈধ নিবন্ধন (ট্রেড লাইসেন্স) থাকতে হবে। আর জামানতসহ ঋণের জন্য সম্পত্তির নিবন্ধিত বন্ধক (মর্টগেজ) থাকা বাধ্যতামূলক। পুনঃ অর্থায়ন সুবিধায় ঋণের জন্য সুদহার ৫ শতাংশ। এ ছাড়া ঋণ পরিশোধ সঠিকভাবে হলে ১ শতাংশ ক্যাশব্যাকের মতো প্রণোদনা দেওয়া হয়। ইউসিবি ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়।
বাড়ি তৈরিতে দুই কোটি টাকা ঋণ
ইউসিবির ‘আয়মা’ নারী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা, নির্মাণ, সংস্কার কিংবা ঋণ পরিশোধের জন্য হোম লোনের সুবিধা রয়েছে। চাইলে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) এই ঋণের সুবিধা নিতে পারবেন। এই সেবার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা ঋণ পাওয়া যাবে। এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২৫ বছর পর্যন্ত। এ জন্য বেতনভুক্ত, ব্যবসায়ী ও স্বনিয়োজিত নারীর কমপক্ষে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সে জন্য বেতনভুক্ত নারীর ৪০ হাজার টাকা, স্বনিয়োজিত পেশাজীবীর ৬০ হাজার টাকা ও ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক ও এনআরবি নারীর মাসে ৬০ হাজার টাকার আয় থাকতে হবে।
এ ছাড়া ২০ লাখ টাকার পারসোনাল লোন নেওয়া যাবে এই সেবার আওতায়। মূলত বিয়ে, ভ্রমণ, শিক্ষা, সিএনজি কনভারশন, চিকিৎসা বা চিকিৎসার সরঞ্জাম কেনায় ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়া যাবে। এই ঋণ পুরোপুরি আনসিকিউরড অর্থাৎ কোনো নগদ জামানত বা সম্পদ বন্ধক রাখতে হয় না। এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। এই ঋণ নেওয়ার জন্য বেতনভুক্ত নারীর ২৫ হাজার টাকা, চিকিৎসকের ৩৫ হাজার টাকা, স্বনিয়োজিত ৪০ হাজার টাকা ও ব্যবসায়ী নারীর মাসে ৪৫ হাজার টাকা আয় থাকতে হবে। আর নারীর বয়স ন্যূনতম ২১ বছর হতে হবে।
তিন ধরনের কার্ডের সুবিধা
গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেনকে সহজ ও নিরাপদ করতে আয়মা সেবার আওতায় মোট তিন ধরনের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা রয়েছে। কেনাকাটা, কিস্তির সুবিধা, ভ্রমণ, ডাইনিং ছাড়, রিওয়ার্ড পয়েন্ট—সব মিলিয়ে গ্রাহকেরা নানা সুবিধা পাবেন।
‘আয়মা’ ব্যাংকিং সেবার মধ্যে রয়েছে মাস্টারকার্ড ক্ল্যাসিক কার্ড, ভিসা ক্ল্যাসিক কার্ড ও ভিসা সিগনেচার কার্ড। এর মধ্যে মাস্টারকার্ড ক্ল্যাসিক কার্ডে ঋণের সীমা ২০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। এই কার্ডের মাধ্যমে (দ্বৈত মুদ্রা) ডুয়েল কারেন্সি সেবা নেওয়া যাবে। এ ছাড়া ২০০–এর বেশি মার্চেন্ট থেকে ১২ মাস পর্যন্ত শূন্য শতাংশ সুদে কিস্তির সুবিধা নেওয়া যাবে। এ ছাড়া ১৮টি গুরুতর রোগে এক লাখ টাকার বিমার সুবিধা (নিবন্ধন সাপেক্ষে) পাওয়া যাবে। এই সেবার আওতায় ভিসা ক্ল্যাসিক কার্ডেও প্রায় একই ধরনের সুবিধা পাওয়া যায়।
আর ভিসা সিগনেচার কার্ডের ঋণের সীমা জামানতবিহীন ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা। আর জামানতসহ ঋণের সীমা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। প্রথম তিন মাসে সুপার স্টোর ও ডাইনিংয়ে ১০ শতাংশ ক্যাশব্যাক (সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা) সুবিধা পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ঢাকা ও কক্সবাজার বিমানবন্দরে ইম্পেরিয়াল লাউঞ্জে প্রবেশ করা যাবে (কার্ডধারীসহ তিনজন)। আর ১৮টি গুরুতর রোগে তিন লাখ টাকার বিমার সুবিধা পাওয়া যাবে।
৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ
নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আয়মা দীপ্তি নামে একটি কিস্তিভিত্তিক টার্ম ঋণ সেবা রয়েছে। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে। এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ এক থেকে পাঁচ বছর। সে ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তার কমপক্ষে এক বছর ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
এই ঋণ মূলধন, কৃষি উৎপাদন ও বিপণন ও অন্যান্য বৈধ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নেওয়া যাবে। এই সেবার আওতায় কোনো ধরনের জামানত ছাড়া ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুবিধা পাওয়া যায়। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ করলে ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আয়মা জ্যোতি সেবার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ওভারড্রাফট ঋণের সুবিধা রয়েছে। অতিক্ষুদ্র, কটেজ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ঋণ প্রযোজ্য। এর আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের মেয়াদ এক বছর, যা প্রতিবছর নবায়নযোগ্য।
কমপক্ষে এক বছর ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, এমন নারী উদ্যোক্তারা এ সুবিধা পাবেন। কার্যকরী মূলধন, কৃষি উৎপাদন, বিপণনসহ বিভিন্ন বৈধ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এই ঋণের ক্ষেত্রে জামানত প্রয়োজন হবে। নির্ধারিত সময় বা মেয়াদ শেষে সম্পূর্ণ সমন্বয় করলে ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনার সুযোগ রয়েছে।
আরও যা রয়েছে
নারী উদ্যোক্তা, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে আয়মা এন্টারপ্রেনিউর নামে বিশেষ কিছু আমানতভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা রয়েছে। এর একটি চলতি হিসাব ‘স্বনির্ভর’ নামে ব্যাংক হিসাব। মূলত নারী পরিচালিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি বিশেষ চলতি হিসাব। এ জন্য নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, একক মালিকানা ব্যবসা, অংশীদারি ও লিমিটেড কোম্পানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা এনজিও হতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫১ শতাংশ শেয়ার নারীদের হতে হবে।
নারী কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে স্বাবলম্বী ইজি অ্যাকাউন্টের সুবিধা। ন্যূনতম ১০ টাকা জমা দিয়ে এই ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে। যেসব নারী একক মালিকানার ব্যবসা পরিচালনা করেন, কিন্তু নিজের নামে ট্রেড লাইসেন্স নেই, তাঁরাও এই সেবা নিতে পারবেন। এই হিসাব খোলার জন্য কোনো ধরনের ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন নেই।
আরেকটি সেবা হলো আয়মা প্রত্যয় মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প। সিএমএসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য মাসিক কিস্তিভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্প। নিয়মিত মাসিক জমার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে একটি নির্ধারিত অর্থ পাওয়া যাবে। এ জন্য ৫ বা ১০ বছর মেয়াদি সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা করে সঞ্চয় খোলা যাবে।