
অনিয়ম-দুর্নীতির প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মুনাফায়।এ কারণে ব্যাংক খাতে সিএসআর ব্যয় কমে গেছে।
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমে অর্ধেকে নেমেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মুনাফায়। ফলে সিএসআর ব৵য় কমিয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। মুনাফার হিসাব থেকে সিএসআর ব্যয় করে থাকে ব্যাংকগুলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব ব্যাংক আগে সিএসআর ব্যয়ে এগিয়ে ছিল, তার অনেকগুলোই ইতিমধ্যে লোকসানে পড়ে গেছে। আবার কোনো কোনোটি মুনাফা কমায় সিএসআর ব্যয় কমিয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে সিএসআর ব্যয় কমেছে।
সিএসআর ব্যয় কত কমেছে
বিদ্যমান নিয়মে কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে কোনো ব্যয় করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একটি ব্যাংক ১০০ টাকা সিএসআর ব্যয় করলে তার মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ করে মোট ৬০ শতাংশ; পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ২০ শতাংশ এবং আয়-উৎসারী কাজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া, সংস্কৃতিসহ অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ খরচ করতে পারে।
২০১৫ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর সিএসআর খাতে ব্যয় করেছিল ৫২৭ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে কমে হয় ৪৯৭ কোটি টাকা। তবে ২০১৭ সালে সিএসআর ব্যয় ৭৪৪ কোটিতে উন্নীত হয়, যা ২০১৮ সালে ৯০৫ কোটি, ২০১৯ সালে ৬৪৮ কোটি, ২০২০ সালে ৯৬৮ কোটি ও ২০২১ সালে ৭৫৯ কোটি টাকা হয়। ২০২২ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর ব্যয় করে ১ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে ৯২৪ কোটিতে নামে এবং ২০২৪ সালে আরও কমে ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা হয়। ২০২৫ সালে তা আরও কমে ৩৪৫ কোটি টাকায় নামে।
খরচে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক
২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৪৯ কোটি টাকা সিএসআর ব্যয় করেছিল এক্সিম ব্যাংক। এরপরই প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রায় ৪৭ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ও ইসলামী ব্যাংক ৪২ কোটি টাকা করে খরচ করে। যমুনা ব্যাংক খরচ করে ৩৬ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এক্সিম, প্রিমিয়ার ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। এরপর এসব ব্যাংক শীর্ষ সিএসআর ব্যয়ের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে।
দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সিএসআর ব্যয়ে প্রথমবারের মতো বিদেশি ব্যাংক শীর্ষে উঠে আসে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গত বছরে ৩৩ কোটি টাকা খরচ করে। এরপর এক্সিম ব্যাংক ২৭ কোটি টাকা খরচ করে। ব্যাংকটি লোকসানে পড়ায় সুদ বা মুনাফার যে অংশ আয়ে নেওয়া যায় না, তা থেকে খরচ করে। যমুনা ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক ২৫ কোটি টাকা করে খরচ করে।
কোন খাতে খরচ
২০২৪ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর খাতে ৬১৫ কোটি টাকা খরচের মধ্যে শিক্ষা খাতে ১০৮ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ১৫৫ কোটি টাকা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন খাতে ২২ কোটি টাকা খরচ করে। অন্যান্য খাতে খরচ করে ৩৩০ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলো ২০২৫ সালে শিক্ষা খাতে ৯৮ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৮৬ কোটি টাকা এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন খাতে ৩৪ কোটি টাকা খরচ করে। অন্যান্য খাতে খরচ করে ১২৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ফেরে। এতে মুনাফা কমে যায়। ফলে সিএসআর ব্যয়ও কমেছে। নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়েছে। আমরাও বেশি মানুষ উপকৃত হয়, এমন খাতে সিএসআর করে যাচ্ছি। আশা করছি, সামনে ব্যয় আরও বাড়বে এবং ব্যাংকগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে এই টাকা খরচ করবে।’