গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে আজ সকালে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে আজ সকালে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।

গভর্নরের নিয়োগ ও বিদায় নিয়ে দিনভর যা হলো

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিদায়টা সুখকর হলো না। নিয়োগ বাতিলের আগে কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। এরপর আজ তাঁর নিয়োগ বাতিলের পাশাপাশি মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মোস্তাকুর রহমান পেশায় ব্যবসায়ী ও হিসাববিদ। এর মাধ্যমে দেশে প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।

এ নিয়ে দিনভর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উত্তেজনা চলে। মোতায়েন করা হয় বাড়তি পুলিশ।

দিনভর যা হলো

আজ সকালে বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ও বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এসব দাবি না মানলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতিতে যাবেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা—এমন ঘোষণা দেওয়া হয় সমাবেশ থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের প্রতিবাদে সংস্থাটির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।

প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি নিয়ে বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেগুলো আমলে নেননি। বরং উনি দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’

শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওনার (গভর্নর) অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখি না। উনি ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছেমতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে ওনাকে জবাবদিহি করতে হবে।’

এ সময় শোকজ ও বদলি প্রত্যাহারের দাবি জানান শাহরিয়ার সিদ্দিকী। তা না হলে সবাইকে শোকজ ও বদলির দাবি জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, ‘বিগত সাত-আট মাস ধরে ন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছি গভর্নরের কাছে। কিন্তু তিনি তা মানেননি। আমরা আশা করি, উনি আমাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নেবেন। কোনো অন্যায্য দাবি জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিক্ষোভে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আজ বুধবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে

অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন, এসবের তীব্র নিন্দা জানাই। গতকাল আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিশের জবাব দেওয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য ওনার কাছে গেলেও উনি দেখা করেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া আজকের মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। যদি তা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আগামীকাল থেকে প্রতীকী কলমবিরতিতে যাব। আর রোববার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ বলেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা। আট দিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার ওই তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। এর আগে গত সোমবার তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

শেষ সময়ে আহসান এইচ মনসুর যা জানালেন

কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভার পর আহসান এইচ মনসুর এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় পরিচালিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন করছেন। কর্মকর্তাদের অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস রুলস মেনে চলতে হবে। যদি কেউ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান, তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রক্ষায় কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।

গভর্নর হিসেবে আহসান এইচ মনসুর এই সংবাদ সম্মেলন করার পরপরই জানতে পারেন, নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এরপর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চলে আসেন

গভর্নর তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে যখন খাতটি কাঠামোগত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিটি পদক্ষেপকে হতে হবে আইনি ও প্রশাসনিক বিধিমালা অনুযায়ী সুসংহত। মূলত আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারের কৌশলগত প্রচেষ্টাই বর্তমান প্রশাসনের মূল চালিকা শক্তি, যা আর্থিক মধ্যস্থতার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতে আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

গভর্নর বলেন, সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং সামগ্রিক বাজার স্থিতিশীল রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি কৌশলগত ও আবশ্যিক দায়িত্ব। এ জন্য ব্যাংকগুলোকে টাকা দেওয়া হয়েছে। এই হস্তক্ষেপ না করা হলে আমানতকারীরা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পেতেন না, যা জাতীয় অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করত। এই আর্থিক সহায়তা কোনো একক ব্যাংকের জন্য নয়, বরং গোটা খাতের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এরপরও এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দাঁড়াতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই এসব বিষয়ে কথা বলার। এ জন্য তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

গভর্নরের পদত্যাগ চান কর্মকর্তারা—এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আহসান মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদত্যাগ করতে আমার মাত্র দুই সেকেন্ড সময় লাগবে। আমি এখানে এসেছি জাতির সেবা করতে। দেশের এই সংকটকালীন সময়ে জাতীয় কর্তব্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

গভর্নর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একটি কুচক্রী মহল সাধারণ কর্মকর্তাদের ভুল পথে পরিচালিত করে ব্যাংকগুলোকে আবার সেই পুরোনো ‘লুটেরা’ মালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ব্যাংকগুলোকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং কোনোভাবেই আগের ঋণখেলাপি মালিকদের কাছে এগুলো ফেরত যেতে দেওয়া হবে না।

গভর্নর বর্তমানে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ঘোষণা করেন, জনগণের করের টাকা এবং আমানত শুধু জনস্বার্থেই ব্যবহৃত হবে। প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কোনো প্রকার ‘দুরভিসন্ধিমূলক কার্যক্রম’ বা অযৌক্তিক কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না। একটি দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

কর্মকর্তা–কর্মচারীদের এই বিক্ষোভ চলার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আজ বুধবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে

‘মব’ তৈরি করে বের করা হলো গভর্নরের উপদেষ্টাকে

আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলন করার পরই আলোচনা শুরু হয় নতুন গভর্নর নিয়োগের। এরপরই আহসান এইচ মনসুর বাসায় চলে যান। বাসায় চলে যাওয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাঁকে বিদায় জানান।

এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘মব’ তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। তাঁরা ‘ধর ধর’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় আহসান উল্লার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলায় নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম।

এ ছাড়া নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌশল ও সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারত। হঠাৎ করে গভর্নর পদে পরিবর্তনে ভালো বার্তা যায় না। আহসান এইচ মনসুর জ্ঞানী মানুষ, তিনি ভালো করছিলেন। তাঁর সময়ে অনেক ভালো কাজ হয়েছে। গভর্নরের পদটা সংবেদনশীল পদ। তাঁকে দেশের আর্থিক নীতি, বিদেশি ঋণ, দাতা সংস্থাসহ নানা পর্যায়ে যোগাযোগ রাখতে হয়। ওনার সময়ে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমাদের সময়ের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া আরও অনেক কাজ হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যা খুবই প্রয়োজন। যদি এই নীতি সরকার যথোপযুক্ত মনে না করে, তাহলে পরিবর্তন আনতে পারে।’