০% ইএমআই

কিস্তিতে কেনাকাটায় স্বস্তি

ইলেকট্রনিক পণ্য ও গৃহস্থালিসামগ্রী মিলছে ইএমআইতে
ছবি: এআই/প্রথম আলো

মধ্যবিত্তের স্বপ্নগুলো অনেক সময় মাসিক বেতনের খামে বন্দী থাকে। একটি ভালো মানের ল্যাপটপ, ড্রয়িংরুমের জন্য একটি বড় টিভি কিংবা প্রচণ্ড গরমে স্বস্তির জন্য একটি এসি—প্রয়োজন থাকলেও এককালীন বড় অঙ্কের টাকা খরচ করা অনেকের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব। সঞ্চয় করে টাকা জমাতে জমাতে অনেক সময় পণ্যের দাম বেড়ে যায় অথবা প্রয়োজনটাই ফুরিয়ে যায়। ঠিক এই সীমাবদ্ধতা ক্রেডিট কার্ডের ‘শূন্য শতাংশ (০%) ইএমআই’ সুবিধায় উত্তরণ সম্ভব হচ্ছে।

শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্নগুলো এখন আর কেবল জমানো টাকার ওপর নির্ভর করে না। বাসার জরুরি প্রয়োজন বা কাঙ্ক্ষিত বড় গৃহস্থালি সামগ্রী কিংবা শখের স্মার্টফোন—সবই এখন হাতের নাগালে। আর এই অসাধ্যসাধনের সুযোগ মিলছে ক্রেডিট কার্ডের একটি ফিচার: ‘০% ইএমআই’ বা সুদবিহীন কিস্তিসুবিধায়। এককালীন বড় অঙ্কের টাকা পরিশোধের চাপ কমিয়ে এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নিয়ে এসেছে এক বড় স্বস্তি।

তবে এই স্বস্তিকে টেকসই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ক্রেডিট কার্ড নীতিমালায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা মূলত গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি।

 নতুন নীতিমালা: গ্রাহকের সুরক্ষা যখন প্রাধান্য

কার্ডভিত্তিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে এবং গ্রাহক যেন অজান্তে ঋণের জালে জড়িয়ে না পড়েন, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে:

 লুকানো খরচ নিষিদ্ধ: আগে অনেক ব্যাংক শূন্য শতাংশ ইএমআই বললেও ‘প্রসেসিং ফি’ বা ‘অ্যাডমিন ফি’ নামে বড় অঙ্কের টাকা কেটে নিত, যা প্রকারান্তরে সুদের মতোই কাজ করত। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে এখন সব ধরনের চার্জ গ্রাহককে লেনদেনের আগেই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কোনো লুকানো চার্জ আরোপ করা এখন দণ্ডনীয় অপরাধ।

সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার কোনোভাবেই সাধারণ ঋণের সর্বোচ্চ হারের চেয়ে ৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকের জন্য এটি ২০ শতাংশের আশপাশে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কোনো কারণে গ্রাহক যদি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন, তবে ব্যাংক চাইলেই চক্রবৃদ্ধি হারে জরিমানা বা অতিরিক্ত সুদ যোগ করতে পারবে না।

 বিলে স্বচ্ছতা: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহক যদি ন্যূনতম বকেয়া পরিশোধ করেন, তবে ব্যাংক শুধু অবশিষ্ট বকেয়া টাকার ওপর সুদ ধরতে পারবে; সম্পূর্ণ বিলের ওপর নয়। এটি ইএমআই ব্যবহারকারীদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি।

 আন্তর্জাতিক লেনদেন: ভ্রমণ কোটার অধীন কার্ডে ডলার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখন আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পাসপোর্ট এনডোর্স না করে আন্তর্জাতিক লেনদেন করা এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া ই-কমার্সে আন্তর্জাতিক কেনাকাটার ক্ষেত্রে একক লেনদেনের সীমাও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

পকেটের ওপর চাপ যখন সহনীয়

ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট বা ইএমআই ব্যবস্থার মূল সৌন্দর্য হলো বিভাজন। যখন এর সঙ্গে ‘শূন্য শতাংশ’ যুক্ত হয়, তখন ক্রেতাকে পণ্যের মূল দামের বাইরে বাড়তি একটি টাকাও সুদ হিসেবে দিতে হয় না। বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড, ফার্নিচারের শোরুম, এমনকি হাসপাতালসহ নানা ক্ষেত্রে পণ্য ও সেবাগুলোয় ৩ থেকে ৩৬ মাস পর্যন্ত এই সুবিধা মিলছে।

 ধরা যাক, একজন সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবী ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ল্যাপটপ কিনতে চান। এই পুরো টাকা একবারে দেওয়া তাঁর মাসিক বাজেটে বিশাল ধাক্কা দিতে পারে। কিন্তু শূন্য শতাংশ ইএমআই–সুবিধায় ১২ মাসের কিস্তিতে তিনি প্রতি মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে ল্যাপটপটি ঘরে নিতে পারছেন। এই যে নগদ টাকার প্রবাহ বা ‘ক্যাশ ফ্লো’ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, এটাই মধ্যবিত্তের জন্য বড় স্বস্তি।

দেশে সুবিধা মিলছে যেসব খাতে 

বাংলাদেশে শূন্য শতাংশ ইএমআইয়ের পরিধি এখন আর কেবল ইলেকট্রনিকস পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে যেসব খাতে এই সুবিধা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে:

 ইলেকট্রনিকস ও গ্যাজেট: মুঠোফোন, ল্যাপটপ, টিভি ও এসি কেনাকাটায় প্রায় প্রতিটি ব্যাংকই শূন্য শতাংশ ইএমআই দিচ্ছে।

 আসবাব ও গৃহসজ্জা: দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্নিচার ব্র্যান্ডগুলো এখন ইএমআইয়ের মাধ্যমে কিস্তিতে ঘর সাজানোর সুযোগ দিচ্ছে।

 স্বাস্থ্যসেবা: বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশন বা বড় অঙ্কের চিকিৎসা বিল এখন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে শূন্য শতাংশ কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়।

 ভ্রমণ ও পর্যটন: এয়ারলাইনসের টিকিট এবং হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও এই সুবিধা এখন জনপ্রিয়।

 ই-কমার্স ও এয়ারলাইনস: কো-ব্র্যান্ডেড কার্ড এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। নির্দিষ্ট ই-কমার্স সাইটে কেনাকাটা করলে শূন্য শতাংশ ইএমআইয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্যাশব্যাক এবং এয়ারলাইনস কার্ডের মাধ্যমে টিকিট কিনলে ফ্রি লাউঞ্জ–সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ মিলছে। এটি মূলত গ্রাহকের খরচকে বিনিয়োগে রূপান্তর করে। 

সম্ভাবনা: আরও যেসব ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে পারে

বিদেশের তুলনায় বাংলাদেশে ইএমআইয়ের ক্ষেত্র এখনো কিছুটা সীমিত। এটি আরও প্রসারিত হতে পারে নিচের খাতগুলোয়:

 শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি বা পেশাদার কোর্সের ফি পরিশোধে শূন্য শতাংশ ইএমআই চালু হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা সহজতর হবে।

 বিমা প্রিমিয়াম: জীবনবিমা বা স্বাস্থ্যবিমার বার্ষিক প্রিমিয়াম কিস্তিতে দেওয়ার সুবিধা গ্রাহকদের আরও বিমায় আগ্রহী করবে।

 কৃষি যন্ত্রপাতি: প্রান্তিক কৃষকদের জন্য উন্নত কৃষি সরঞ্জাম (যেমন: ট্রাক্টর বা সেচপাম্প) কিস্তিতে কেনার ব্যবস্থা করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব আসবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বনাম দেশ

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় ‘বাই নাউ, পে লেটার’ (বিএনপিএল) বা শূন্য শতাংশ ইএমআই সংস্কৃতি আমাদের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।

 উন্নত বিশ্ব: আমেরিকা বা ইউরোপে অ্যামাজন বা ওয়ালমার্টের মতো জায়ান্টরা ক্রেডিট কার্ড ছাড়াই থার্ড পার্টি অ্যাপের মাধ্যমে শূন্য শতাংশ ইএমআই দিচ্ছে। সেখানে ক্রেডিট স্কোরের ওপর ভিত্তি করে একজন শিক্ষার্থীও তাৎক্ষণিক লোন পায়।

 বাংলাদেশ: বাংলাদেশে এই সুবিধা এখনো মূলত ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ডিজিটাল ব্যাংকিং নীতিমালা আমাদের দেশের ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভবিষ্যতে এ ধরনের সহজ কিস্তিসুবিধা দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে।