
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল ও নতুন গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়ার পুরো কাজ শেষ হয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।
গত সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠক করেন আহসান এইচ মনসুর। বৈঠক শেষে আহসান মনসুর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা কী কী সংস্কার করছি, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছি। এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এ ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গতকাল বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে আহসান এইচ মনসুরের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে দেয়। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট চার বছরের জন্য গভর্নর পদে নিয়োগ পাওয়া আহসান মনসুরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ১২ আগস্ট। আলাদা প্রজ্ঞাপনে চার বছরের জন্য গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয় ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সচিবালয়ের দপ্তর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে গত মঙ্গলবার নতুন গভর্নরের নাম দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নথি উপস্থাপন প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশনা দেন অর্থমন্ত্রী।
সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান, বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনটি নাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপস্থাপনের চর্চা রয়েছে। গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নামই যায় এবং এবারও সেটাই হয়েছে।
নিয়মানুযায়ী গভর্নরের নিয়োগ বাতিল ও নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে। একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। অর্থমন্ত্রী সম্মতি দিলে তা যায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিলে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি হয় বাতিল ও নিয়োগের দুই প্রজ্ঞাপন।
আজ বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকও উপস্থিত ছিলেন। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অর্থমন্ত্রী ও গভর্নর একসঙ্গে বেরিয়ে চলে যান অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা গভর্নরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তিনি রাজি হননি।
এদিকে হঠাৎ পরিবর্তনের নেপথ্য ঘটনা জানতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন, বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে কেন এভাবে বিদায় দিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো? জবাবে অর্থমন্ত্রী তিনবার বলেন, ‘কিছুই বলার নেই।’
আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের দিন গত বুধবারও তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিস করছিলেন। গণমাধ্যমে তাঁর চুক্তি বাতিলের খবর পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে বাসায় চলে যান বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন।
গতকাল বুধবার আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে কথা হয়েছে—এমন কিছু সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় একধরনের মব হয়েছে এবং যেটা হয়েছে, তা অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। কারণ, দুদিন আগেই তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই দিন বা তারপরের দিনও অর্থমন্ত্রী তাঁকে ইঙ্গিত দিতে পারতেন যে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হবে। জানলে তিনি এক দিনও সময় নিতেন না।
যোগাযোগ করলে আহসান এইচ মনসুর গতকাল কথা বলতে চাননি। তবে তাঁর বরাতে গতকাল একটি সূত্র জানায়, আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, কিছু অসম্পূর্ণ কাজ ছিল, এগুলো শেষ করে যেতে পারেননি। কোনো আশাবাদ দেখছেন না তিনি। গভর্নর হাউস ছেড়ে বাসা ভাড়া নেওয়ার খোঁজে দিন কাটিয়েছেন গতকাল। আগামী রোববার তিনি তাঁর সাবেক কর্মস্থল পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) কার্যালয়ে যাবেন। আহসান এইচ মনসুর ওই সূত্রটিকে আরও বলেছেন, ‘দেশটিতে জন্ম নিয়েছি বলেই আছি। নইলে কবেই চলে যেতাম।’