প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক

উত্তরবঙ্গের কৃষি খাতকে উজ্জীবিত দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী

উত্তরবঙ্গের কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প খাতকে আরও উজ্জীবিত দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছে উত্তরবঙ্গে আরও বিনিয়োগ চান তিনি। এ জন্য বর্তমান বাস্তবতা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সব ধরনের নীতি সহায়তা দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে আজ সোমবার বিভিন্ন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে।

বেলা ১১টা থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সচিবালয়ে বৈঠক হয় দুই দফায়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দফায় ছিলেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিইও পারভেজ সাইফুল ইসলাম, কাজী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী জাহেদুল হাসান ও পরিচালক কাজী জাহিন হাসান, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের এমডি তামারা হাসান আবেদ এবং সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রোর সহযোগী পরিচালক মো. আজিজুল হক।

দ্বিতীয় দফার বৈঠকে ছিলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী, নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি ও সিইও মো. আমিনুল ইসলাম এবং টি কে গ্রুপের গ্রুপ পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ও পরিচালক তারেক আহমেদ, আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের চেয়ারম্যান এস কে শামীম উদ্দিন, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিইও সৈয়দ জহুরুল আলম, লাল তীর সিডসের পরিচালক তাজওয়ার আউয়াল ও মহাব্যবস্থাপক মো. আলমগীর হোসেন এবং প্যারাগনের এমডি মশিউর রহমান।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক থেকে দুই মাস পর প্রধানমন্ত্রী আবারও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলে তাঁদের জানিয়েছেন।

বৈঠক শেষে কাজী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী জাহেদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে শিল্পায়ন বিশেষ করে কৃষি খাত, কৃষিপণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন এবং এগুলোর রপ্তানি বৃদ্ধি নিয়ে কী করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অনেক যৌক্তিক আলোচনা করেছেন এবং জানতে চেয়েছেন কী হলে এ খাতের ভালো হবে। আমরা সম্ভাবনা ও সঙ্গে সমস্যার কথা তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রী এগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’

উদাহরণ হিসেবে কাজী জাহেদুল বলেন, ‘আমরা বড় আকারে জৈব সার উৎপাদন করি। রাসায়নিক সারে সরকার ভর্তুকি দিলেও জৈব সারে দেয় না। অথচ জৈব সার জমির জন্য বেশি ভালো। এটা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি। তিনি বলেছেন, আমদানি বিকল্প হওয়া সত্ত্বেও জৈব সার কেন ভর্তুকি পাবে না?’

বৈঠক শেষে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেছেন। উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে কৃষির বিকাশ নিয়ে আমরা যেসব কথা বলেছি, তা প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। অঞ্চলভিত্তিক কৃষিকে নিয়ে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী চিনিশিল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন এবং বলেছেন আমরা যেন চিনিশিল্পে বিনিয়োগ করি।’ বর্তমান জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে বর্তমান কষ্ট লাঘব করার ওপর জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রধানমন্ত্রী সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সৌরবিদ্যুতে করসুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ–চালিত গাড়ি কম টোল দিয়ে যাতে যমুনা সেতু পার হতে পারে, সে বিষয়েও কথা হয়েছে।

ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমরা কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছি। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কীভাবে রপ্তানি বাড়ানো যায়, তা–ও উঠে এসেছে আলোচনায়। প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন আমাদের কী দরকার। আমরা নীতি সহায়তার কথা বলেছি এবং প্রধানমন্ত্রী তা দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’

প্যারাগনের এমডি মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জমি না বাড়লেও খাদ্য চাহিদা বাড়ছে—এ কথা উল্লেখ করে মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বলেছি যে পোলট্রি, মৎস্য ও দুগ্ধশিল্পে বড় সমস্যা ভুট্টা উৎপাদন। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পতিত জমিতে ভুট্টা চাষ বাড়ানো দরকার।’ তিনি আরও বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া কারখানা অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি আইনে আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এতে এক কারখানা থেকে আরেক কারখানায় রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে। সরকারি গবেষণাগার সক্রিয় করা দরকার, যাতে করে রোগজীবাণু চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা যায়। এসব বিষয় তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে বলেছেন যে স্ব স্ব মন্ত্রণালয় এগুলো নিয়ে কাজ করবে।

নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি ও সিইও মো. আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরবঙ্গকে স্বাবলম্বী দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য উত্তরবঙ্গকে আরও বেশি উৎপাদনশীল করা, এখানে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং এখান থেকে আরও বেশি রাজস্ব আয় সংগ্রহ করতে চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি এ অঞ্চলে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন এবং কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেওয়া, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, আমের সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়েও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, উত্তরবঙ্গের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নীতি সহায়তা দেওয়া হবে।

টি কে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা উত্তরবঙ্গে বাণিজ্যিক চাষাবাদ করার জন্য জমি চেয়েছি। আর এ জন্য দরকার হবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের। এ ছাড়া কম সুদে তহবিল ও কর সুবিধাও চেয়েছি। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য বন্ড সুবিধা দরকার হবে। এসব কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের এমডি তামারা হাসান আবেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারের বৈঠকে উত্তরবঙ্গ নিয়েই বেশি আলোচনা করেছেন। প্রথমবারের মতো আমাদের ডেকে নিয়েছেন তিনি এবং সময় নিয়ে আমাদের কথা শুনেছেন। জাতি গঠনের জন্য এটা একটা ইতিবাচক দিক। শস্য, দুগ্ধশিল্প, মধুসহ উত্তরবঙ্গের কৃষি খাতকে কীভাবে আরও বেশি উৎপাদনশীল করা যায় এবং এসব খাতে কীভাবে আরও বেশি বিনিয়োগ আসতে পারে, তা জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’ তামারা হাসান আবেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ চেয়েছেন এবং বলেছেন যে সরকার যত দূর সম্ভব সহায়তা দেবে। তবে সরকারের একার পক্ষে সব করা সম্ভব হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৈঠকের বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা সব অঞ্চলের সব মানুষের জন্য সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিলাম। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা চাই, যে অঞ্চল যে অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত, সেই অঞ্চলে সেই উপযোগী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিতে। তারই অংশ হিসেবে উত্তরাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রপ্তানির হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। সে জন্য এ খাতের উদ্যোক্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছি। তাঁদের পরামর্শ শুনেছি। এরপর সরকারের দিক থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, ‘দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার। এ জন্য বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও কর আহরণ—এটিই আমাদের মডেল। বেসরকারি খাতই এই মডেলের কেন্দ্রে। আমরা বিশ্বাস করি, বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে। আর উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। আর বিনিয়োগ ও উৎপাদন যত বাড়বে, সরকারের কর আহরণ তত বাড়বে।’