অভিমত

এই বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে সংস্কার করতে হবে

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। তবে ২০২৯ সালের পর আর সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই। এই তিন বছরেই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রাজস্ব ও শুল্কনীতি সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল কাঠামোর মধ্যে প্রথম তিন বছরকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ধরে এসব সংস্কার করতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকেই এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসিসহ (সিডিপি) জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতগুলো মূল্যায়ন করেছে। এসব সংস্থার মূল্যায়নেও সময় বাড়ানোর বিষয়টি সমর্থন করা হয়। সরকারের অনুরোধ এবং সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ।

মোস্তাফিজুর রহমান

জাতিসংঘ নিজেই বলেছে, এই তিন বছর সময়কে কাজে লাগাতে হবে। বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। এই সংস্কারের মধ্যে আছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, উপযোগী রাজস্বনীতি ও শুল্ক–করনীতি প্রণয়ন, বাজারসুবিধা চলে গেলে প্রতিযোগিতাসক্ষমতা ধরে রাখা ইত্যাদি। ওষুধশিল্পের ওপর যে নেতিবাচক অভিঘাত পড়তে পারে, সেখানেও প্রস্তুতির কথা বলেছে জাতিসংঘ। এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণের জন্য সরকারের যে মসৃণ রূপান্তর কৌশল (স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি) আছে, তা বাস্তবায়ন করার সুপারিশও করা হয়েছে।

এসব সংস্কারের বিষয়টি এখন আমাদের নিজেদেরও অনুধাবন করতে হবে। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তাই সময় ধরে ধরে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যবসা–বাণিজ্য শুরুর খরচ কমাতে হবে। বিনিয়োগ–বাণিজ্য পরিবেশের উন্নতি করতে হবে।

সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল কাঠামোর অধীন প্রথম তিন বছরকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল হিসেবে ধরা উচিত। এ সময় প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করে ফেলতে হবে। এই এলডিসি ইস্যুকে ওই পাঁচ বছরের কৌশলপত্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।

তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি খাতের পরিবর্তে বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকাও লাগবে। রপ্তানিপণ্যের বাজারসুবিধা ২০২৯ সালের পরেও থাকবে। আমাদের বড় বাজার—যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারে ২০৩২ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা থাকবে। এখন পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্য পণ্য রপ্তানিও কীভাবে বাড়ানো যায়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানিপণ্যের তালিকা বড় করার পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় করতে হবে।

তিন বছর পর এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর আর সুযোগ নেই। অর্থনীতি যেন প্রতিযোগিতাসক্ষম থাকতে পারে, সে জন্য ২০২৯ সালের মধ্যে এসব সংস্কার করতেই হবে। কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া শুরু হয়েছে। যেমন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা; মাতারবাড়ী অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে যৌক্তিক পরিণতিতে নিতে হবে। উত্তরণ তিন বছর পেছানোর ফলে যে জানালা সামনে এসেছে, তা কাজে লাগাতে হবে।

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)