
ডিজেলের পরিবর্তে বিদ্যুতের সাহায্যে রেলের ইঞ্জিন চলবে, এমন একটি নতুন প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। এতে খরচ হবে ৩ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। যার মাধ্যমে ঢাকা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। সংগ্রহ করা হবে বিদ্যুৎ–চালিত ইঞ্জিনসহ কোচ।
আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই প্রকল্পটি পাসের জন্য উঠানো হতে পারে। প্রকল্পটি পাস হলে গণপরিবহনের উন্নতির পাশাপাশি পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সভায় সব মিলিয়ে ১৫টি প্রকল্প উঠছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, রেলপথে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপনের পাশাপাশি ১৬ সেট বৈদ্যুতিক ট্রেন কেনা হবে, প্রতি সেটে ৫টি করে কোচ থাকবে। ২০৩১ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার সময়সীমা ঠিক করা হয়েছে।
‘নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদ্যুতিক রেলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভবিষ্যতে এর কোনো বিকল্প দেখছেন না তাঁরা। জানতে চাইলে যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারতে ৭০ শতাংশ এবং চীনে ৯৫ শতাংশ ট্রেন বিদ্যুতে পরিচালিত হয়। আমাদের এই রূপান্তরে দীর্ঘ সময় লাগবে। কিন্তু সে জন্য শুরু করতে হবে। এটি ডিজেলের মতো জ্বালানি অপচয় ও অনিয়ম ঠেকাতেও কার্যকর হবে। রেলের গতিও বাড়বে।’
নতুন এ ব্যবস্থায় যথাযথ প্রস্তুতির বিষয়ে সতর্ক করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এই রেল সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। আবার এ প্রযুক্তির জ্ঞানসম্পন্ন জনবলও দরকার। আগেও ডেমু ট্রেন যথাযথ লোকবল না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়নি। তাই আমাদের সতর্ক হতে হবে, যেন এ উদ্যোগ সফল হয়।’
কেন এই প্রকল্প
প্রকল্প প্রস্তাব অনুসারে, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনে ট্রেন চালালে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্রেনের তুলনায় জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম হয়ে থাকে। ভবিষ্যতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবেশবান্ধব হিসেবে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করতে হবে। তাই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক ট্রেনে দ্রুত গতি বৃদ্ধি করা যায়, আবার কমানোও যায়। এ কারণে এ পথে ট্রেনের গড় গতিবেগ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণের সময়ও কমবে। ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলতে পারবে বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথ দেশের অন্যতম ব্যস্ত শিল্পাঞ্চল ও রাজধানীর প্রবেশপথের সঙ্গে যুক্ত। এই পথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে রেলপথে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সড়কপথের ওপর চাপ কমবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। একই সঙ্গে ডিজেলচালিত ট্রেনের ব্যবহার কমায় কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ কমবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখন বৈদ্যুতিক ট্রেন চলাচল করছে। ভবিষ্যতে সেদিকেই যেতে হবে। তাই বাংলাদেশেও সেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। নতুন লাইনটি সফলতা পেলে পর্যায়ক্রমে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটেও এই লাইন সম্প্রসারিত করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ট্রেন চলাচলের জন্য ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ৫টি করে কোচ নিয়ে ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন কেনা হবে। ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুর প্রান্তে একটি ইএমইউ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানাও নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৯৪২ কোটি অর্থায়ন করা হবে। ঋণদাতা সংস্থা এডিবি ও ইআইবি থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এটিই এ ধরনের প্রথম প্রকল্প হওয়ায় খাতভিত্তিক আলাদা ব্যয় উল্লেখ করা হয়নি বলে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে।
দরপত্রের মাধ্যমে কোচ সংগ্রহ করা হবে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, চীন বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো বৈদ্যুতিক কোচও তৈরি করে থাকে। তাই চীন থেকেই কোচ সংগ্রহ করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।
ব্যয় কমেছে ৪৬০ কোটি
প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। গত ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় যৌক্তিক করার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে যানবাহন কেনার ব্যয় বাদ দেওয়া হয়েছে।
পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্গঠিত প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ১২ শতাংশ কমানো হয়েছে। এতে চূড়ান্ত প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব রেলযোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা তৈরি হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুরো রেলব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনায় নিয়ে আসা হচ্ছে। আমরা রেলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। সে জন্যই এ প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও একগুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।’