
আগের মতো দেশ চালাতে চাইলে চলবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অর্থায়নের কাঠামো বদলে গেছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘১ থেকে ২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার জন্য কি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পেছনে দৌড়াব? নাকি কাল সকালে একটা (ফান্ড) তহবিল গঠন করে নিজের দেশের বাজারে ঢোকাব? বিনিয়োগের বিপরীতে ভালো মুনাফা পেলে কেন আমি অপেক্ষা করব যে কে, কবে আমারে টাকা দেবে, কী শর্তে দেবে? আমার দরকারটা কী?’
আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এতে স্বাগত বক্তব্য দেন।
প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি সংস্থা পিপিআরসির চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রফেসোরিয়াল ফেলো সেলিম জাহান, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব উর রহমান, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, রাজধানীর মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা ও বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।
বাংলাদেশ বিমানকে ১২টি উড়োজাহাজ কেনার খরচ সরকার কেন দেবে? বিমান একটি এন্টারপ্রাইজ। তারা পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিতে পারে।—আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অলিগার্ক অর্থনীতি থেকে সরে আসতে চাই। প্রত্যেক নাগরিকের যাতে সুযোগের সমান অধিকার থাকে অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলক থাকে, অর্থনীতির সুফল যেন সবার কাছে যায়। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ হচ্ছে আমাদের দর্শন।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির একটি বিরাট গোষ্ঠী করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে কামার, কুমার, তাঁতি অর্থাৎ যত ধরনের লোক আছেন, তাঁরা কোনো দিনই বাজেটের আওতায় আসেননি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন; কিন্তু উন্নতি নেই জীবনে। এসব মানুষকে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার আওতায় নিয়ে আসা হবে। তাঁদের জন্য বাজেটে একটি তহবিল থাকবে। তাঁরা দিন এনে দিন খাচ্ছেন; কিন্তু তাঁদের পণ্যে মূল্য সংযোজন হচ্ছে না।’
থিয়েটারসহ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও কখনো বাজেটে আসেনি, এ কথা বলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা ও বড় বড় শহরে আমরা থিয়েটার করব। থিয়েটার ডিস্ট্রিক করব। এসব করতে না পারায় আমরা এগোতে পারিনি। আমাদের সফট পাওয়ার নেই। অথচ পাশের দেশের চলচ্চিত্র, সংগীত ইত্যাদি বিশ্বের অন্য দেশে যাচ্ছে।’
উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে পাহাড় থেকে একজন লোক এলেন অন্য কাজে। বললেন তিনি ছবিও আঁকেন। আমি তাঁকে বললাম, একদিন নিয়ে আসতে। নিয়ে এলেন তিনি। বিউটিফুল সব ছবি। দাম জানতে চাইলে বললেন পাঁচ হাজার টাকা। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, কী বলো! পরে লিটু ভাইকে বলে তাঁর ছবিগুলো নিয়ে একটা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হলো। দেখা গেল একেকটা ছবি ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এগুলো হচ্ছে জিডিপি। তাঁর খরচ জিডিপি, তিনি যে বিক্রি করছেন, তা–ও জিডিপি, রপ্তানি করছেন জিডিপি এমনকি বৈদেশিক মুদ্রা আয়। এ ধরনের বিরাট একটা জনগোষ্ঠীকে আমরা বাজেটে আনছি। এটা হচ্ছে বাজেটের একটা বৈশিষ্ট্য।’
সুশাসন বনাম সংস্কার নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগের মতো অবস্থা। তবে আমরা সার্বিক সংস্কারে যাচ্ছি। রেস্তোরাঁ করার জন্য ১৩টা অনুমতি আর লাগবে না। লাগলেও তা এক জায়গা থেকে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। শুল্ক বিভাগ, বন্দরের নাম উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবকিছুতেই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় যেতে হবে। দেখেছি যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খরচ বৃদ্ধি শুরু হয়। এখানে পয়সা দিতে হবে, ওখানে দিতে হবে, এই মাশুল–সেই মাশুল, এগুলো করতে করতে ১০ শতাংশ দাম বেড়ে যায়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ব্যবসায়ের খরচটা কমিয়ে আনা।’
সুদের হার ও ব্যাংকের সক্ষমতা নিয়েও অর্থমন্ত্রী কথা বলেন। তিনি বলেন, ব্যাংক চলতি মূলধন দিতে পারে। গাড়ি–বাড়ি কেনার জন্য ঋণ দিতে পারে। অথচ দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ঋণ দিয়ে দেয়। এক ব্যাংক না পারলে এমনকি চার ব্যাংক মিলে দেয়। এগুলো অদক্ষতা। তাঁর প্রশ্ন, সরকার সব জায়গায় পয়সা দেবে কেন? বাংলাদেশ বিমানকে ১২টা উড়োজাহাজ কেনার খরচ সরকার কেন দেবে? বিমান একটা এন্টারপ্রাইজ। তারা পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিতে পারে।
বড় অর্থায়নের জন্য অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারকে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার বদলে উচিত হচ্ছে পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া। পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়ে গেছে বুঝি। খুব দ্রুত এ বাজারকে কার্যকর করা হবে। পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিলে সুদ দিতে হবে না, যতক্ষণ না পয়সা কামানো হবে। পয়সা কামালেই লভ্যাংশ। অন্যদিকে আছে বন্ড বাজার। ৭, ৮ বা ৯ শতাংশ সুদে বন্ড বাজার থেকেও ঋণ নেওয়া যায়। এভাবে ব্যবসায়ের খরচ কমানোর ব্যবস্থা করা হবে। তবে আছে আমলাতন্ত্রের খরচ। এটাও থাকবে না। অনলাইন হলে খরচ আরও কমে যাবে। আমরা ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড, ওয়ান ওয়ালেট’ করব।
তামাক খাতকে বড় আয়ের জায়গা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী এ–ও বলেন, ‘এখানে বিরাট চুরি আছে। শব্দটা খুব খারাপ হয়তো। ফাঁকি বলি। ফাঁকি বা চুরি যা-ই বলি না কেন, এখানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কর দিচ্ছে। স্থানীয়রা কম দিচ্ছে। কেউ আবার দিচ্ছেও না। এখানে একটা কালোবাজার গড়ে উঠেছে। এটাতে চুরি করা মানে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাওয়া।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, পানীয় খাতে কোকাকোলা, পেপসি কর দিলেও আরও অনেক আছে, যাদের আবার বাজারে ভালো অংশগ্রহণ (মার্কেট শেয়ার) আছে। তামাকের মতো এ খাতেও কারা কর দিচ্ছে না, তা বের করতে বলা হয়েছে। কারণ, যারা কর দিচ্ছে, তারা অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছে।
একটার পর একটা ধরছি—এমন মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কর নীতি শেষ করছি। এটা একটা বড় সমস্যা। সবাই সবকিছু বলছি; কিন্তু করনীতি নিয়ে কেউ কিছু বলছি না। নতুন করে কেক বানাতে হবে। এ জন্য আমি আগের বিলটা পাস করতে দিইনি। আমি চাই যে বাংলাদেশের মানুষ যেন করনীতিটা বোঝে, বাংলাদেশের ডিএনএ বোঝে। শিল্প বুঝতে হবে, বাণিজ্য বুঝতে হবে, শুল্ক বুঝতে হবে এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি বুঝতে হবে। এই খাত থেকে এত নিয়ে নাও, ওই খাত থেকে এত নিয়ে নাও—এটা তো করনীতি হতে পারে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এমন একটা করনীতি দিতে হবে, যাতে মানুষ কর দিতে চাইবে এবং কর দিয়ে মানুষ মনে করবে যে তিনি একজন করদাতা। আমি দুই বছরের কথা বলে আসছি। ধৈর্য ধরে এটুকু সময় অপেক্ষা করুন। এর মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। এ দেশ হবে একটি কল্যাণমূলক দেশ। কত প্রবৃদ্ধি হলো এ ইতিহাস বলে লাভ নেই। সাধারণ মানুষের কী লাভ হলো, সেটিই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধি হবে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন বদলাবে না, তাতে কোনো লাভ নেই। জানি এটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।’
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে বলে আমরা কাজ করতে পারছি—এই কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখন সবাই কাজ করছে। কারণ, কাজের ফল আসছে। এমনকি আমলারাও কাজ করছে সপ্তাহে সাত দিন। তাঁরা দেখছে যে ভালো কিছু হতে চলছে। অনেক বাধা আছে। এই বাজেটে কিছু আসবে। তবে ছয় মাসের মধ্যে কাজগুলো শেষ করব।’