হিমাগারে আলু বাছাই করছেন শ্রমিকেরা। গত সোমবার রংপুরের তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারে
হিমাগারে আলু বাছাই করছেন শ্রমিকেরা। গত সোমবার রংপুরের তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারে

১২ বছরে ৭ বারই লোকসান, এবারও আলু নিয়ে বিপাকে রংপুরের কৃষক

রংপুরের কৃষকের কাছে আলু একসময় ছিল ‘নগদ টাকার ফসল’। মৌসুম শেষে আলু বিক্রির টাকাতেই বছরের বেশির ভাগ সময় চলত অনেক পরিবার। কিন্তু গত এক যুগে বারবার লোকসানের ধাক্কায় সেভাবে চলার স্বপ্ন ও বাস্তবতা এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

কৃষকেরা জানান, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সে তুলনায় দাম মিলছে না। আবার পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা যেমন নে্ই, তেমনি বিপণনব্যবস্থাও বেশ দুর্বল। ফলে এ অঞ্চলের চাষিরা আলু নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য এবং রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বার্ষিক বাজার পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের ৭ বছরই আলু চাষে লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬, ২০১৯, ২০২০, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আলু চাষে কৃষকেরা লাভবান হয়েছেন। আর ২০১৪, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮, ২০২১, ২০২২ ও ২০২৫ সালে তাঁদের লোকসান গুনতে হয়েছে।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, গত বছর শুধু রংপুরের আট উপজেলার কৃষকেরা চার লাখ বস্তা আলু হিমাগার থেকে তোলেননি। এতে তাঁদের প্রায় ৬০ কোটি এবং হিমাগারের মালিকদের দুই কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। এবারও একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে রংপুরে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, সহজ কৃষিঋণ, রপ্তানি প্রণোদনা ও আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা জরুরি।

কৃষকদের বাঁচাতে সরকারের কাছে নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়ে রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সহসম্পাদক মোবারক হোসেন মনছুর বলেন, এ মুহূর্তে সরকারের উচিত উৎপাদন খরচের সঙ্গে ৩৩ শতাংশ মূল্যসহায়তা দিয়ে আলুর দাম নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে ক্ষতিপূরণ প্রদান।

এদিকে নতুন করে চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আলু লাগানো শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু হিমাগার পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে ১৩ টাকায়। খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টাকায়।

দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ আলু রংপুরে উৎপাদিত হয়। অথচ এ অঞ্চলে মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ আছে। তাই উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ ও দাম পাওয়া নিয়ে প্রতিবছরই কৃষক বিপাকে পড়েন।
সিরাজুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক, ডিএই, রংপুর।

স্থানীয় কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সর্বশেষ ২০২৫–২৬ মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ১৬ টাকা। বস্তা ক্রয়সহ মাঠ থেকে হিমাগার পর্যন্ত পরিবহন খরচ পড়েছে গড়ে আরও দুই টাকা। প্রতি কেজি আলু হিমাগারে সংরক্ষণে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৬ টাকা; অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন ও হিমাগার ভাড়া মিলিয়ে কেজিপ্রতি খরচ পড়েছে ২৪ টাকা। সেই আলু বর্তমানে হিমাগার গেটে গড়ে ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে হিমাগারে রাখা আলুতে কৃষকের কেজিপ্রতি ১২ টাকা লোকসান হচ্ছে। অথচ সরকার হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ২২ টাকা।

রংপুর কৃষি বিপণন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ মৌসুমে জেলার ৪২টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাওয়ার আলু সংরক্ষিত ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ জন কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টরে আলুর আবাদ করেছিলেন। মোট উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন আলু।

হিমাগারে আলু বাছাই করছেন শ্রমিকেরা। গত সোমবার রংপুরের তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারে

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক মো. শাহজালাল ইসলাম বলেন, ‘জনবলসংকটের কারণে আমরা আলুতে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারি না। তবে তাঁদের যে ব্যাপক লোকসান হচ্ছে, সেটি বলতে পারি।’

গত সোমবার রংপুরের তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারের সামনে কথা হয় লক্ষ্মীপুর গ্রামের আলুচাষি অহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার আলুর কেজি ২২ টাকা নির্ধারণ করি দিয়া এসিত বসি চুপচাপ বসি আছে। এপ্যাকে আলু কায়ও নেওচে না। আলু ধরিয়া হামরা কান্দোচি।’

আগের দিন রোববার বদরগঞ্জের আমরুলবাড়ি গ্রামের ব্যাঙেরদোলা মাঠে কথা হয় আলুচাষি ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ধানের দাম নাই। আলু হামার কোমর ফ্যালে দেছে। ২০১৪ সাল থাকি সাতবার আলুত লস খাছি। এবার হিমাগারোত আলু থুচি ৩০০ বস্তা। তাক কেজিতে লস হওচে ১২ টাকা। তাহইলে তোরায় কন, আলু হিমাগার থাকি বাইর করি কী হইবে? ওটে কোনায় পচি যাউক।’

* ১২ বছরের মধ্যে সাত বছরই লোকসান গুনেছেন রংপুরের আলুচাষিরা।* প্রতি কেজি উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার খরচ ২৪ টাকা; বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়* আলুভিত্তিক শিল্প, রপ্তানি ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানোর দাবি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের।

পীরগাছার অন্নদানগর গ্রামের কৃষক সাহেব আলী বলেন, ‘লাভের আশায় আলু চাষ করতে করতে ফকির হয়া গেছি। ঋণ করে চাষ করি, কিন্তু বছর শেষে লোকসান ছাড়া কিছুই পাই না।’

গঙ্গাচড়া উপজেলার লালচাঁদপুর গ্রামের চাষি সেকেন্দার আলী বলেন, ‘ভাই, আলুর দাম ২০২৪ সালোত বাড়ছেল। তখন সরকারের মাতাব্বরের অভাব ছিল না। সরকারি লোকজন হিমাগারোত আসিয়া হামাক জেলোত ঢুকার হুমকি দিয়া আলু বেচাইতে বাধ্য করছে। এ্যালা লস হওচে, ওই মাতাব্বরা আইসে না ক্যান! কেউ তো হামার খোঁজও নেওচে না!’

রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব বিশ্বজিৎ বণিক বলেন, ‘এবার ৪২ একরে আলু চাষ করে সাড়ে ৭ হাজার বস্তা পেয়েছি। লাভের আশায় আরও ১৭ হাজার বস্তা কিনে হিমাগারে রেখেছি। গত বছর প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এবার তো আসলমোশলে গায়েব। আলু চাষ আর না করার চিন্তা করছি।’

ডিএইর রংপুর অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ আলু রংপুর অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। অথচ এ অঞ্চলে মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ আছে। তাই উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ ও দাম পাওয়া নিয়ে প্রতিবছরই কৃষক বিপাকে পড়েন। আলুভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি বাড়ানো ছাড়া সংকট কমবে না।’

রংপুর কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আলু আবাদ করে কৃষক লাভ তো দূরের কথা, যদি উৎপাদন খরচও তুলতে না পারেন। তাহলে তাঁরা খেয়ে-পরে পরিবার নিয়ে বাঁচবেন কীভাবে?

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি কাঠামো শক্তিশালী করা না গেলে কৃষকেরা ধীরে ধীরে আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।