জ্বালানি তেল
জ্বালানি তেল

জ্বালানি–সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পণ্য সরবরাহ

জ্বালানি–সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধের স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হতে শুরু করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। কারণ, জ্বালানি তেলের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সব যানবাহন রাস্তায় নামানো যাচ্ছে না। শুধু তা–ই নয়, জ্বালানি–সংকটে শিল্পকারখানায় পণ্য উৎপাদনও ব্যাহত হতে শুরু করেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত দুই দিনে পণ্যভিত্তিক বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় পণ্য সরবরাহ ১০ শতাংশের মতো কমে গেছে। এমনকি নদীপথে আসা অপরিশোধিত লবণ কারখানার নেওয়ার জন্য ভাড়ায় ট্রাকও পাচ্ছি না।
কামরুল হাসান, প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা, এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ড

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় পণ্য উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ না বাড়ানো হলে পণ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম। সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশেও আতঙ্কিত মানুষ পেট্রলপাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত রোববার থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তার আগে ৬ মার্চ ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দেয় বিপিসি।

নিত্যপণ্য সরবরাহে প্রভাব

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পণ্য পরিবহনের সাড়ে তিন হাজার ট্রাক রয়েছে। এসব ট্রাকের জন্য ডিপো থেকে তেল কিনে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে তেল পাচ্ছে না তারা। ফলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ট্রাক অলস পড়ে আছে। এতে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করতে পারছে না শিল্প গ্রুপটি।
এমন তথ্য দিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ফিলিং স্টেশন থেকে সিরিয়াল দিয়ে তেল নিতে বলা হয়েছে। তবে একবার লাইন ধরলে আধা বেলা চলে যাচ্ছে। আবার অধিকাংশ পাম্পে তেলও মিলছে না। এ অবস্থায় জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।’

সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স রোববার বাণিজ্যসচিবকে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে কোম্পানিগুলো নিজস্ব পরিবহনের অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছে না। এমনকি ভাড়া গাড়িও পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বাজারে ভোজ্যতেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। এ জন্য জ্বালানি তেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

চলমান বৈশ্বিক সংকটে সবার ওপরই কমবেশি প্রভাব পড়েছে বা পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়, এ বাস্তবতা সবাইকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি

দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ এসিআইয়ের ভোগ্যপণ্য সরবরাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাদের নিজস্ব ট্রাক ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে যেটুকু তেল পাচ্ছে, তা দিয়ে চাহিদা মিটছে না।

এ বিষয়ে এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ট্রাকগুলো চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় পণ্য সরবরাহ ১০ শতাংশের মতো কমে গেছে। এমনকি নদীপথে আসা অপরিশোধিত লবণ কারখানার নেওয়ার জন্য ভাড়ায় ট্রাকও পাচ্ছি না।’

এদিকে জ্বালানি–সংকটে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ওষুধশিল্পের মালিকেরা। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি গতকাল জ্বালানিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে ফিলিং স্টেশনে ওষুধ পরিবহনে নিয়োজিত গাড়িতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি তেল দেওয়ার সীমা শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছে।

জানতে চাইলে ওষুধ শিল্প সমিতি মহাসচিব মো. জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কারখানা থেকে কেন্দ্রীয় গুদাম এবং কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে ডিপো ও দোকানে যানবাহনে ওষুধ পৌঁছাতে  জ্বালানি তেলের প্রয়োজন। সেই তেল নিতে রাতের বেলায় সিরিয়াল দিতে হচ্ছে ট্রাকগুলোকে। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। এভাবে চলতে থাকলে ওষুধ সরবরাহে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বয়লার ব্যবহৃত হয়। বর্তমান সংকটে কারখানাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না। সে জন্য লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে। প্রতিটি কারখানাকে ৫০০ লিটার ডিজেল সরবরাহ করতে ফিলিং স্টেশনকে নির্দেশনা দিতে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ঈদের আগে সব কারখানার পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণে বাড়তি চাপ থাকে। এখনই জ্বালানি সরবরাহে উদ্যোগ নেওয়া না গেলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

করণীয় কী

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, চলমান বৈশ্বিক সংকটে সবার ওপরই কমবেশি প্রভাব পড়েছে বা পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়, এ বাস্তবতা সবাইকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে সরকার জ্বালানি দেওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।