আখাউড়া স্থলবন্দর
আখাউড়া স্থলবন্দর

ভারতের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আখাউড়া স্থলবন্দরে, এক বছরে রাজস্ব আয় কমে অর্ধেক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দরের রাজস্ব আয় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। এই বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্য ও যাত্রী পারাপার কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই স্থলবন্দর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে ৫২ শতাংশের বেশি।

স্থলবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি ১৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে নেমে এসেছে ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব আয় কমেছে ৫ কোটি ৩১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা বা ৫২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভারত থেকে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন কয়েকটি পণ্য আমদানিতে দেশটির নিষেধাজ্ঞা, ভিসা জটিলতার কারণে মানুষের যাতায়াত কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে এই ধস নেমেছে।

স্থলবন্দরটির ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই স্থলবন্দর দিয়ে ৪৬ হাজার ৪৬১ জন যাত্রী ভারতে ভ্রমণে যান। আর এই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ৩১ হাজার ৫০৫ জন যাত্রী। তাতে সব মিলিয়ে ভ্রমণ কর বাবদ সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৬০ হাজার ৪৫২ জন যাত্রী ভারতে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। আর ওই বছর ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন ৪০ হাজার ৫০৯ জন যাত্রী। এতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি ২ লাখ টাকা।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, ডলারের দামের ওঠানামা এবং কিছু পণ্যের ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি কমে গেছে।
–নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন

এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৫৪ জন যাত্রী। আর ওই বছর ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন প্রায় ৬৬ হাজার যাত্রী। এতে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে ভ্রমণ কর বাবদ রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ১৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। যাত্রী পারাপার কমে যাওয়ায় এই বন্দর থেকে ভ্রমণ কর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে গত অর্থবছরে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমে যাওয়ায়ও কমেছে রাজস্ব আয়।

স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় ৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বা ৮৩ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার সমমূল্যের আগরবাতি, জিরা ও চাল আমদানি হয়েছে। এসব পণ্য আমদানি থেকে শুল্ককর বাবদ রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ৭১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা সমমূল্যের জিরা, ডাল ও কাজুবাদাম আমদানি হয়েছিল। এতে ওই বছর শুল্ককর বাবদ আদায় হয় প্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এতে দেখা যাচ্ছে এক বছরের ব্যবধানে পণ্য আমদানি থেকে এই বন্দরের রাজস্ব আয় তিন কোটি টাকার বেশি কমে গেছে।

জানতে চাইলে স্থলবন্দরটির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি কমলেও এই বন্দর দিয়ে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। আমদানি বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরাও দাবি জানিয়ে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তা ছাড়া বন্দরের উন্নয়নকাজ চলছে। উন্নয়নকাজ শেষে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছি।’

বন্দরের হিসাবে, আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল সিমেন্ট, তাজা মাছ, শুঁটকি, পাথর, পটেটো পেলেট, আটা ও ময়দা, পাম তেল, মশারি নেট ইত্যাদি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে রপ্তানি হয়েছিল ৫১৪ কোটি টাকার পণ্য। ওই বছর রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সিমেন্ট, তাজা মাছ, শুঁটকি, পাথর, ম্যাঙ্গো ফ্রুট ড্রিংকস, প্লাস্টিকের আসবাব, মেলামাইনসামগ্রী, পিভিসি পাইপ, পিভিসি দরজা ইত্যাদি।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে এই বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়। তবে আখাউড়া মূলত রপ্তানিমুখী স্থলবন্দর। বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানিও হয়, তবে তা রপ্তানির তুলনায় কম। আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে জিরা, ডাল, কাজুবাদাম, পেঁয়াজ, আদা, পাথর, ভুট্টা ইত্যাদি।

আখাউড়া স্থলবন্দরের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নিছার উদ্দিন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভারত-বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক, ডলারের দামের ওঠানামা এবং কিছু পণ্যের ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি কমে গেছে। এখন উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে দুই পক্ষের উদ্যোগ দরকার।