বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আজ সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখছেন বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আজ সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখছেন বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষ বাড়বে ১২ লাখ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ গরিব মানুষ বাড়তে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমতে পারে। তারা দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পারবে না, এমন কথা বলছে বিশ্বব্যাংক।

আজ বুধবার বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সেখানে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারবেন না, এর একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। এখন কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি দিনে তিন ডলারের কম আয় করলে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে আজ সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।

এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

যুদ্ধের প্রভাবে গরিব মানুষ বাড়তে পারে

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন।

বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠবেন, কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারেন। এর মানে, এ বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন। বিশ্বব্যাংক বলছে, যুদ্ধাবস্তা না থাকলে ২০২৮ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে।

প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ বলা হয়েছে। এগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমের কম মজুরি, কর্মসংস্থানের গতি যাওয়া। এ ছাড়া বৈষম্য বাড়বে, এমন পূর্বাভাসও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে এ বছর দারিদ্র্যের হার কমবে মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে দারিদ্র্য কমে।

বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে। তাঁর মতে, শোভন কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা দরকার।

জ্যঁ পেম বলেন, বিগত দিনে প্রয়োজনীয় যেসব সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই সংস্কার যেন অব্যাহত থাকে। যদিও সংস্কার খুব কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ৬ খাতে

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে। ১. চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নস্ট হতে পারে। কারণ, আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। ২. ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। ৩. জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ৪. ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। ৫. আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। যেমন সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি খরচ বৃদ্ধি। ৬. বৈষম্য বাড়তে পারে। ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠবেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠতে পারেন। এর মানে, এ বছর প্রায় ১২ লাখ মানুষ গরিব থেকে যাবেন।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

এর আগে জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ঠিক করেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। নতুন সরকার অবশ্য এখনো জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক বলছে, আগের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চারটি চ্যালেঞ্জ আছে। এগুলো হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন রাজস্ব আয়, আর্থিক খাতের ঝুঁকি ও বহিঃখাতের চাপ। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এসব চ্যালেঞ্জ আরও পাকাপোক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। জরুরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুযোগ কম। কারণ, দুর্বল রাজস্ব খাতে আদায় বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা আছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিতে সীমিত সুযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকিং খাত এবং অপর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত।

মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে

বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এখনো এ দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের মতো, যা সীমিত আয়ের মানুষকে ভোগাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি কঠোর এবং ব্যাংক খাত ভঙ্গুর থাকায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে জানুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। এখন ইরান যুদ্ধের কারণে সেই পূর্বাভাস আরও কমানো হলো।

সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে

বিশ্বব্যাংক সংস্কারে মনোযোগ দিতে বলেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে স্বল্পমেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে। কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। নতুন শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।

যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে, তা হলো সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো শক্তিশালী করা। যখন আমদানি খরচ বেড়ে যায়, তখন ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ, দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সরবরাহের দিকটি ঠিক রাখতে হবে। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকসহ কিছু বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল, প্রতিযোগিতা নীতি জোরদার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমতা নিশ্চিত, বাণিজ্যনীতি সহজ করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।