আজ প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান
আজ প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান

প্রথম আলো গোলটেবিল

ওষুধের কাঁচামালে অগ্রিম আয়কর কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হোক: সিমিন রহমান

ওষুধ খাতের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান। একই সঙ্গে তিনি করের আওতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন।

আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় সিমিন রহমান এ কথা বলেন। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে সিমিন রহমান বলেন, আমদানি পর্যায়ে যে ৫ শতাংশ এআইটি কাটা হয়, তা এনবিআর থেকে কখনো ফেরত পাওয়া যায় না। আমরা প্রস্তাব করছি এটি কমিয়ে ৩ শতাংশে আনা হোক। একইভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর (টিডিএস) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হোক। এতে ব্যবসার ওপর থেকে অবাস্তব করের বোঝা কমবে।

আর্থিক খাতের সংস্কার সময়ের দাবি

অনুষ্ঠানে সিমিন রহমান বলেন, ‘আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন। বর্তমান সরকার বিগত আমল থেকে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তার প্রভাব সরাসরি ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ছে। আমরা যারা ব্যবসায়ী সমাজ, তারা প্রতিদিন আর্থিক খাতের সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

আর্থিক খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে সিমিন রহমান বলেন, ‘এই সংস্কারগুলো করা সহজ কথা নয়, তবে আমাদের সঠিক সংস্কারের দিকেই এগোতে হবে।’

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো ও করের আওতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সিমিন রহমান। তিনি বলেন, আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত এখন মাত্র ৬ শতাংশ, যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশে নেওয়া উচিত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর সমান সমান হওয়া উচিত। এ জন্য বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের সনাতনী করব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় যেতে হবে। এ ছাড়া সারা দেশে সব শিল্পের জন্য একটি সুষম ভ্যাট হার থাকা উচিত বলে মত দেন তিনি। বলেন, এটি না হলে কারসাজির সুযোগ থেকে যায়।

ওষুধ শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রয়োজন

ওষুধ খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সিমিন রহমান কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অর্থমন্ত্রীর সামনে। এসব সুপারিশের একটি হলো, রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া। তিনি বলেন, রপ্তানির উদ্দেশ্যে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) শূন্য করা প্রয়োজন। আমরা শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আনছি, আবার সেই পণ্য রপ্তানি করছি। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ অন্য দেশের তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া পোশাক খাতের মতো ওষুধ শিল্পের রপ্তানিকারকদের জন্যও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দরকার।

গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার দাবি জানান সিমিন রহমান। তিনি বলেন, আরঅ্যান্ডডি থেকে ফলাফল পেতে ৫-৬ বছর সময় লাগে, অথচ আমাদের শুরু থেকেই করের বোঝা বইতে হয়। এ ছাড়া ওষুধের স্যাম্পল ও বিপণনের ওপর এনবিআরের দেওয়া শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের সীমা (ক্যাপ) তুলে দেওয়ারও অনুরোধ করেন তিনি।

বেভারেজ বা পানীয় শিল্পের ওপর করের হার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সিমিন রহমান বলেন, বাংলাদেশে এই খাতে মোট করের হার ৫৪ শতাংশ, যেখানে ভারতে ৪০ শতাংশ ও ভিয়েতনামে মাত্র ২০ শতাংশ। গত তিন বছরে সম্পূরক শুল্ক ও টার্নওভার কর ক্রমাগত বাড়ানো হয়েছে। পানীয় খাতের ন্যূনতম কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগের মতো ১ শতাংশে ফিরিয়ে আনার এবং বোতলজাত পানির ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারেরও অনুরোধ জানান সিমিন রহমান।

এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ‘সুগার ট্যাক্স’ বা চিনি-নির্ভর কর কাঠামোর প্রস্তাব দিয়ে এই শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, ‘এই খাতে ফ্ল্যাট সম্পূরক শুল্ক না দিয়ে যে পণ্যে চিনির পরিমাণ বেশি, সেখানে কর বেশি হবে; আর যেখানে কম, সেখানে কর কমবে। এতে নাগরিকেরা স্বাস্থ্যকর পণ্য বেছে নিতে উৎসাহিত হবেন।’