উত্তরের প্রবেশদ্বার নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র ‘সৈয়দপুর রেলবাজার’। রেল কারখানা ঘিরে যুগ যুগ ধরে এখানে অবিরাম চলছে বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞ।
উত্তরের প্রবেশদ্বার নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র ‘সৈয়দপুর রেলবাজার’। রেল কারখানা ঘিরে যুগ যুগ ধরে এখানে অবিরাম চলছে বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞ।

হাটবাজার

নমুনাতেই তৈরি হয় দেশি-বিদেশি যন্ত্র

কারখানার ভেতরে পা রাখতেই কানে তালা লাগার জোগাড়। চারদিকে শুধু লোহা পেটানোর কানফাটানো শব্দ আর ওয়েল্ডিংয়ের আগুনের ফুলকি। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরোনো জাহাজের স্ক্র্যাপ, মরচে পড়া লোহা আর মেটাল শিট। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ওয়ার্কশপ মনে হলেও এখানকার কারিগরদের কাজের ধরন দেখলে যেকোনো দক্ষ প্রকৌশলীরও চোখ কপালে উঠবে।

তাঁদের হাতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির সার্টিফিকেট নেই, চোখের সামনে ঝোলানো নেই কোনো জটিল ব্লুপ্রিন্ট। শুধু দেশি বা বিদেশি যেকোনো আধুনিক যন্ত্রের একটি ‘স্যাম্পল’ বা নমুনা সামনে এনে রাখলেই হলো—নিখুঁত দক্ষতায় ফেলে দেওয়া স্ক্র্যাপ লোহা দিয়ে তাঁরা ঠিক তেমনই একটি যন্ত্র তৈরি করে দেবেন। নীলফামারীর সৈয়দপুরের প্রায় ৫০০ ওয়ার্কশপের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশলশিল্পের চিত্র এটি। একসময়ের আমদানিনির্ভর এই খাত এখন এই কারিগরদের জাদুকরি হাতের ছোঁয়ায় উত্তরাঞ্চলের এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা সৈয়দপুরকে দেশজুড়ে ‘দ্বিতীয় জিনজিরা’ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

লাগে না ব্লুপ্রিন্ট, স্যাম্পলই শেষ কথা

‘মডেল বা স্যাম্পল দিলে আমরা যেকোনো কিছু বানাইয়া দিতে পারি’—খুব সাধারণ ভঙ্গিতে কথাটি বলছিলেন মামুন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের এক কারিগর। তাঁদের কাজের ধরনটাই এমন। প্রকৌশলবিদ্যায় বড় বড় যন্ত্রপাতির জন্য যেখানে থ্রিডি মডেল বা অটোক্যাডের নিখুঁত ব্লুপ্রিন্ট প্রয়োজন হয়, সেখানে সৈয়দপুরের এই কারিগরদের ভরসা কেবল তাঁদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং বংশপরম্পরায় পাওয়া অভিজ্ঞতা। অনেক সময় যশোর বা বগুড়া থেকে আনা সাধারণ নকশা দেখেই তাঁরা দেশি-বিদেশি যেকোনো যন্ত্রের হুবহু রেপ্লিকা তৈরি করে ফেলেন। বিদেশ থেকে যে আধুনিক কৃষি বা শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানি করতে তিন গুণ বেশি খরচ হয়, এখানকার কারিগরেরা দেশীয় প্রযুক্তিতে অত্যন্ত কম খরচে তা তৈরি করে দিচ্ছেন।

 ইতিহাসের সূত্রপাত: ১৮৭০ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে ব্রিটিশরা সৈয়দপুরে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে সেই কারখানার অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ শ্রমিকেরাই মূলত নিজেদের উদ্যোগে ছোট পরিসরে মেকানিক্যাল পার্টস তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। পাকিস্তান আমলে শুরু হওয়া এই শিল্প স্বাধীনতার পর মহিরুহে পরিণত হয়।

পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ লোহাই যখন শিল্পের প্রাণভোমরা

সৈয়দপুরের এই শিল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তাদের কাঁচামাল। ভারত থেকে আমদানি করা মেটাল শিট, চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পের পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ, অ্যাঙ্গেল, রড এবং স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত পুরোনো লোহা গলিয়েই তাঁরা তৈরি করছেন বৈচিত্র্যময় সব পণ্য। তাঁদের উদ্ভাবনী তালিকায় রয়েছে—

রেলওয়ের ভারী যন্ত্রাংশ: কানেক্টিং রড, হাউজিং, হোস পাইপ, ইঞ্জিন কভার, কাপলিং, বিয়ারিং কভার থেকে শুরু করে ট্রেনের দরজা-জানালা এবং স্ক্রু লিফটিং জ্যাক।

শিল্পকারখানার মেশিন: জুট মিল, টেক্সটাইল মিল এবং তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস কারখানার সুতার মেশিন।

কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ: চালকল বা অটো রাইস মিলের মেশিন, পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের পার্টস এবং রুটি ও ফুচকা তৈরির স্বয়ংক্রিয় মেশিন।

ভারী প্রকল্প: তিস্তা প্রজেক্টের মতো বড় সেচ প্রকল্পের ক্যানেল গেট।

বছরে ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন

বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির জেলা সভাপতি এরশাদ হোসেন পাপ্পু জানান, সৈয়দপুরে প্রায় ৫০০ প্রতিষ্ঠানে হালকা প্রকৌশলশিল্পের কাজে প্রায় ৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এর মধ্যে ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠানে রেলের যন্ত্রপাতির কাজ হয়, যার বার্ষিক উৎপাদন মূল্য ৫০ কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ রেলওয়ে ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে তৈরি স্ক্রু লিফটিং জ্যাক কেনা শুরু করেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।

 সব মিলিয়ে সৈয়দপুরের হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প থেকে বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই শিল্পের সাশ্রয়ী ও টেকসই যন্ত্রপাতির প্রধান ক্রেতা হলেন স্থানীয় ও আশপাশের জেলার প্রান্তিক কৃষকেরা। পাশাপাশি গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, অটো রাইস মিলের মালিক এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা তাঁদের কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে নিয়মিত ভিড় জমান সৈয়দপুরের এই ওয়ার্কশপগুলোতে।

প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের চেয়েও ধারালো অভিজ্ঞতা

এখানকার কারিগরদের কারিগরি দক্ষতা কোনো বই পড়ে আসেনি। মিথুন নামের এক কারখানার মালিক জানান, তাঁর নানা ভারতের খড়গপুর থেকে কাজ শিখে এসেছিলেন। সেই আদি ব্যবসাই তাঁর বাবা করেছেন, আর এখন তিনি করছেন। তাঁদের এই অপ্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার কাছে অনেক সময় হার মানে আধুনিক কারখানার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানও। সরকারি কারখানাগুলোর এক চমকপ্রদ উদাহরণ দিয়ে আলী হোসেন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের কর্ণধার বলেন, ‘রেল কারখানায় অনেক দামি দামি মেশিন আছে, কিন্তু চালানোর মতো দক্ষ লোক নাই। আমার একটা লোক ঢাকা থেকে ক্রেন শ্যাফটের পুলি নিয়ে আসছে, ফিটিং হচ্ছিল না। আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর আমি ২ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে করে দিয়েছি। অথচ ওইখানে ওদের লাখ লাখ টাকার মেশিন অলস পড়ে আছে।’

 ঝুঁকি, সংকট ও আগামী দিনের শঙ্কা

বিশাল এই কর্মযজ্ঞের আড়ালে লুকিয়ে আছে কারিগরদের জীবনের ঝুঁকি। একটানা ১২ ঘণ্টা তীব্র শব্দ ও ধুলাবালুর মধ্যে কাজ করলেও শ্রমিকদের হাতে গ্লাভস বা চোখে সেফটি গ্লাস নেই। নেই কোনো স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা। এর ওপর বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কারণে তাঁরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দিনে দুই-তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এত সম্ভাবনার পরও এই আদি ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত কারখানার মালিকেরা। দীর্ঘদিনের পারিবারিক ব্যবসা হলেও নতুন প্রজন্ম এই কায়িক শ্রম ও ঝুঁকির পেশায় আসতে চাইছে না। একজন ব্যবসায়ী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘আমার ছেলে বিবিএ পড়ছে, সে বলে এই ব্যবসা করবে না। মেয়ে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। তারা এই কষ্ট করতে চায় না।’

 হতাশার মেঘের আড়ালে কিছু আশার আলোও উঁকি দিচ্ছে। এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তাঁদের কাজের কিছুটা স্বীকৃতি মিলতে শুরু করেছে। হালকা প্রকৌশল খাতের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং যুবকদের লেদ মেশিনের কাজের প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

 কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ব্লুপ্রিন্ট ছাড়াই যাঁরা স্যাম্পল দেখে নিখুঁত যন্ত্র তৈরি করতে পারেন, তাঁদের মেধার রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। সহজ শর্তে ঋণ, সরাসরি সরকারি কাজের টেন্ডারে অংশগ্রহণ, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সৈয়দপুরের এই ‘লোহালক্কড়ের জাদুকর’রাই একদিন বাংলাদেশের ভারী শিল্প ও আমদানিবিকল্প পণ্য উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারেন।