— সেবা প্ল্যাটফর্মের কর্মীদের তিন থেকে চার মাসের বেতন বকেয়া।
— চালডালের সবার এক মাসের বেতন এবং ৬০০ জনের দুই মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম ও সেবা প্ল্যাটফর্মের কর্মীদের বকেয়া বেতন নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দুই কোম্পানিতে আড়াই হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন।
যশোরে চালডালের প্রায় ৬০০ কর্মী গত সোমবার বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। সেবা প্ল্যাটফর্মের কর্মীদের তিন থেকে চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরিচ্যুত কর্মীদের নানা পোস্টও দেখা যাচ্ছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, সময়মতো বিনিয়োগ না পাওয়াই এ সংকটের বড় কারণ। প্রতিষ্ঠান দুটির আলাদা তথ্য অনুযায়ী, চালডাল ডটকমে রয়েছে ২ হাজারের বেশি কর্মী। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ কর্মী জানুয়ারি মাসের বেতন পাননি। ফলে তাঁরা এখন অনিশ্চয়তার মধ্য আছেন।
সেবা প্ল্যাটফর্মের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৪৫০ জন কর্মী রয়েছেন। কর্মীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়। বর্তমানে প্রায় ৩০০ কর্মীর তিন থেকে চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেবার প্রোডাক্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের এক কর্মী প্রথম আলোকে জানান, তাঁর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর—এই তিন মাসের বেতন দেওয়া হয়নি। তিন মাসের বেতন এবং দুই মাসের নোটিশ টাইম মিলে বকেয়া বেতনের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
সেবা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সেবা এক্সওয়াইজেডের চেয়ারম্যান আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে তাঁর বেতনের বিপরীতে কর বাবদ প্রায় ১৮ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ তুলে একটি ফৌজদারি মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রোনাল্ড মিকি গোমেজ। পাশাপাশি পাঁচ মাসের বকেয়া বেতন, গ্র্যাচুইটি তহবিলের পাওনা, ট্যাক্স পরিশোধ না করা এবং ছুটি বাবদ প্রাপ্য মিলিয়ে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা আদায়ের দাবিতে শ্রম আদালতেও আরেকটি মামলা করেন মিকি গোমেজ।
ফৌজদারি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-৩–এর অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ সেবা এক্সওয়াইজেডের চেয়ারম্যান আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেবা প্ল্যাটফর্মের সিইও আদনান ইমতিয়াজ বলেন, সেবা শুরু থেকেই পুরোপুরি দেশীয় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা একটি স্টার্টআপ। তবে গত নভেম্বর মাসে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরও চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এক পর্যায়ে রাজস্ব প্রায় শূন্যে নেমে আসায় সংকট তৈরি হয়েছে।
অস্থিরতায় স্টার্টআপ চালডাল
যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে চালডালের কর্মীদের বিক্ষোভের পর গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আবার অফিস শুরু করেছেন কর্মীরা। মূলত ডিসেম্বর মাসের বেতন পরিশোধের পর যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত চালডালের কল সেন্টারের কর্মীরা কাজে ফিরেছেন।
বর্তমানে চালডাল ডটকমের সব কর্মীর মাসিক বেতনের পরিমাণ ১২ কোটি টাকার বেশি।
চালডাল ডটকমের সিইও ওয়াসিম আলিম বলেন, চালডালের যাত্রা শুরুর পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত কখনো বেতন দিতে সমস্যা হয়নি। তবে ২০২৪ সালের পর বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ছিল প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের। কিন্তু সে বছরে ৫০ কোটি টাকার কম তহবিল পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান করলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া যায়। কিন্তু স্টার্টআপের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত। গত এক থেকে দেড় বছরে পর্যাপ্ত বিদেশি বিনিয়োগ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্সের তথ্যমতে, চালডাল ডটকম ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় বিনিয়োগ ছিল ৫৩ লাখ ডলারের বেশি। বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে ২ কোটি ৯১ লাখ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
চালডালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা। রাজস্ব কমে যাওয়ায় কর–পূর্ব মুনাফা কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬৫ কোটি টাকার কর–পূর্ব মুনাফা করলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে হয় ১৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির কর–পরবর্তী লোকসান হয় ৫৬ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪৯ কোটি টাকা।