
সালাদ, নুডলস বা চায়নিজ খাবার তৈরিতে ক্যাপসিকাম এখন বাঙালির খাবারের তালিকায় অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। তাই বাজারে দেশীয় সবজির পাশাপাশি বিদেশি সবজি ক্যাপসিকামের বিক্রিও বেড়েছে। মরিচ বা মসলাজাতীয় এই ক্যাপসিকাম দেশীয় কোনো ফসল না হলেও গত চার বছরে উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি উপযোগী আবহাওয়ার কারণে ক্যাপসিকামের উৎপাদন ও বিক্রি দ্রুত বাড়ছে বলে জানান বিশ্লেষকেরা। আর সবেচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে দ্বীপজেলা ভোলায়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ায় এ সবজি উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহও বাড়ছে। বাজারে চাহিদা থাকায় বিক্রি নিয়ে ঝামেলাও কম। দেশের ভেতরে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্যাপসিকাম উৎপাদিত হচ্ছে ভোলায়। এর কারণ সম্পর্কে ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, চরের জমিতে পলি জমে থাকায় ক্যাপসিকামের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। চরাঞ্চলে এই সবজির উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। কৃষকেরাও নানা প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্যাপসিকাম উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। কারণ, দামও ভালো পাচ্ছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ক্যাপসিকাম উৎপাদন হয়েছিল ৪৭৫ টন। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৩২৪ টন। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫১ টন। সেই হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ১১১ একর জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ হয়েছিল। সর্বশেষ গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৯ একরে। উৎপাদনের জমি বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদনশীলতাও। আগে প্রতি একরে ২ হাজার ৯২২ কেজি ক্যাপসিকাম উৎপাদিত হতো। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৬ কেজি।
দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় মসলাজাতীয় এই কৃষিপণ্যের দামও কিছুটা কমেছে বাজারে। খামারবাড়ির সামনের রাস্তায় দুই বছর ধরে ক্যাপসিকাম বিক্রি করছেন সুধীর চন্দ্র দে। তিনি জানান, সবুজ রঙের ক্যাপসিকামের দাম প্রতি কেজি ২২০ টাকা। আর হলুদ বা লাল রঙের ক্যাপসিকামের দাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকা। স্বাদ ও ঘ্রাণে উন্নত বলে রঙিন ক্যাপসিকামের দাম বেশি বলে জানান তিনি।
দেশে প্রায় ৫০ ধরনের মসলা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এসব মসলার চাহিদার বেশির ভাগই পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে ২০২২ সালে ১২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এর মাধ্যমে দেশের ১১০টি উপজেলায় ১৪টি মসলার উৎপাদন বৃদ্ধির কাজ করা হচ্ছে। ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের ক্যাপসিকাম উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। সেখানে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা থেকে সার ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার উপায় সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আর উৎপাদনের পর প্রদর্শনেরও আয়োজন করা হচ্ছে নিয়মিত।’ মূলত ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা ক্যাপসিকাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
ভোলায় সর্বোচ্চ উৎপাদন
দেশজুড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ক্যাপসিকামের উৎপাদন এলাকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সবজির উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়েছে ভোলায়। ওই অর্থবছরে উৎপাদিত মোট ৩২৪ টন ক্যাপসিকামের মধ্যে ভোলাতেই উৎপাদিত হয় ২৬২ টন। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ টন ক্যাপসিকাম উৎপাদিত হয়েছে সিলেট অঞ্চলে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১ টন ক্যাপসিকামের উৎপাদন হয়েছে নওগাঁয়। এরপর চুয়াডাঙ্গায় ১০ টন ও কুড়িগ্রামে ১০ টন ক্যাপসিকাম উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়া, বগুড়া ও জয়পুরহাটেও এ সবজির ভালো উৎপাদন হয়।।
ভোলা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় ক্যাপসিকাম। এ কারণে এই জেলার কৃষকদের মধ্যে এই সবজি উৎপাদনের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ভোলা থেকে সরাসরি ক্যাপসিকাম চলে যায় ঢাকার কারওয়ান বাজারে। সেখান থেকে সারা দেশের পাইকারি ব্যবসায়ী তা কিনে নিয়ে যান। এ কারণে বিক্রি নিয়েও খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না।
দেশে ক্যাপসিকামের উৎপাদন বাড়তে থাকায় এটির বীজের ব্যবসাও বড় হচ্ছে। বর্তমানে এসিআই, ব্র্যাক ও এআর মালিক সিড ক্যাপসিকামের বীজ বাজারজাত করছে। কৃষকেরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ কিনে থাকেন। তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভারত থেকেও কিছু বীজ আমদানি করা হয়।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বছরের নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই সময়ে ক্যাপসিক্যাম উৎপাদন করা হয়। এই ৪ মাসে ৭ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। ভোলা সদরের মাঝের চরের চাষি মো. শাহজাহান এবার এক হেক্টরের বেশি জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন। এতে তাঁর খরচ পড়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। তবে ১৫ লাখ টাকার বেশি ক্যাপসিকাম বিক্রি করার আশা করছেন তিনি। আগে ১২০ টাকায় প্রতি কেজি ক্যাপসিকাম বিক্রি করলেও এখন ভরা মৌসুমে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।
আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে
কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্যাপসিকাম দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষত মেক্সিকো-পেরু অঞ্চলের কৃষিপণ্য হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। ঝালবিহীন মিষ্টি ক্যাপসিকাম (বেল পেপার) থেকে শুরু করে অত্যন্ত ঝাল মরিচজাত ক্যাপসিকামও রয়েছে। তবে ঠিক কখন এটা বাংলাদেশে এসেছে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পুষ্টিগুণের দিক থেকে ক্যাপসিকাম বেশ গুরুত্বপূর্ণ সবজি। কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘এ’, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ও খনিজ উপাদান প্রচুর পরিমাণে রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সবজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো.উবায়দুল্লাহ কায়ছার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নিজেরা গবেষণা করে এটার স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছি, যা বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’