১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে সৌদি আরব থেকে জাহাজটি দেশের পথে রওনা দিয়েছে
১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে সৌদি আরব থেকে জাহাজটি দেশের পথে রওনা দিয়েছে

এক জাহাজ জ্বালানি তেলে বাড়তি ব্যয় ৬০০ কোটি টাকা

বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও আমদানির বাড়তি খরচ সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই যাবে। পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজার—সবখানেই প্রভাব পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে টানা দেড় মাস দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো জাহাজ আসেনি। এ রকম স্থবিরতার মধ্যেই সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। তবে এই চালানে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এক জাহাজেই বাড়তি খরচ পড়ছে প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা।

তেল আমদানিকারক সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ‘এমটি নাইনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজ গত মঙ্গলবার সকাল ছয়টায় যাত্রা শুরু করেছে। এতে প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রয়েছে, যার দাম ১০০ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার মতো। প্রতি ব্যারেলের দাম পড়ছে ১২৬ দশমিক ২৮ ডলার।

যুদ্ধের আগে একই পরিমাণ তেল আমদানিতে খরচ পড়েছিল প্রায় অর্ধেক। সৌদি আরব থেকে সর্বশেষ তেল এসেছে জানুয়ারি মাসে। তখন ১ লাখ ১০ হাজার টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা বা ৫০ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলার। প্রতি ব্যারেলের দাম পড়েছিল ৬২ দশমিক ৬৭ ডলার। সে হিসাবে নতুন চালানে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে (১২৬ দশমিক ২৮ ডলার)। এ ছাড়া গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে আনা এক লাখ টন মারবান ক্রুড অয়েলের দাম পড়েছিল ৪৮ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫৯০ কোটি টাকা।

*** নতুন জাহাজে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম পড়েছে ১২৬.২৮ ডলার। *** যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেলের দাম পড়েছিল ৬২.৬৭ ডলার।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে নতুন জাহাজ আসার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শরীফ হাসনাত। তিনি বলেন, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ছয়টায় জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে এই তেল দেশে এসে পৌঁছাবে। এরপর শুরু হবে শোধন কার্যক্রম।

তবে বাড়তি আমদানি ব্যয় সরকার একা বহন করছে না। তার প্রতিফলন ইতিমধ্যেই দেখা গেছে খুচরা বাজারে। অর্থাৎ গত শনিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের নতুন দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও আমদানির বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই যাবে। পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজার—সবখানেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিফাইনারির উৎপাদন তলানিতে

ইরান যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। এর পর থেকে দেশে নতুন করে কোনো অপরিশোধিত তেল আসেনি। যুদ্ধ শুরুর আগে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় দেড় লাখ টন অপরিশোধিত তেলের মজুত ছিল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই সেই মজুত শেষ হয়ে যায়। ফলে শোধন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

সরবরাহ ঠিক রাখতে বাড়তি দামে হলেও তেল আনা হচ্ছে। মে মাসে আরও একটি অতিরিক্ত চালান আনার চেষ্টা চলছে।
—মো. রেজানুর রহমান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

স্বাভাবিক সময়ে এই শোধনাগারে দিনে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টন তেল পরিশোধন করা হতো। সেখান থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ ডিজেল উৎপাদন হতো, কিন্তু কাঁচামাল না থাকায় এখন ডিজেল উৎপাদন প্রায় বন্ধ। অল্প পরিমাণে পেট্রল ও বিটুমিন উৎপাদন হচ্ছে।

তবে সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে এই শোধনাগারের অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত। গত বছর ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন ডিজেল উৎপাদন হয়েছে, যেখানে দেশের মোট ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৪২ লাখ টনের বেশি। অর্থাৎ দেশে যে পরিমাণ পরিশোধন হয়, তার প্রায় ছয় গুণ বেশি ব্যবহার হয়। তাই শোধন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি বিপিসির কর্মকর্তাদের। তাঁদের ভাষ্য, দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই পূরণ হয় সরাসরি পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে। ফলে রিফাইনারির উৎপাদন কমে গেলেও বড় প্রভাব বাজারে পড়ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতায় ঝুঁকি

বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে এই তেল এনে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল থেকে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রল ও প্রায় ৩০ হাজার টন ফার্নেস তেল উৎপাদন সম্ভব। এর পাশাপাশি ন্যাফথা ও বিটুমিনও উৎপাদিত হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যার মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত তেল। বাকি ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য।

বিদ্যমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দুটি তেলবাহী জাহাজ এখনো আটকে আছে। ‘নরডিক পলুকস’ নামের একটি জাহাজ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে তেল বোঝাই করে রওনা দিলেও পরে আবার ফিরে যায় এবং এখনো সেখানে অবস্থান করছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে তেল আনার জন্য নির্ধারিত ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের একটি জাহাজের চুক্তি বাতিল হয়েছে। বিকল্প হিসেবে ফুজাইরা বন্দর থেকে তেল নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে, যা হরমুজ প্রণালি এড়াতে সহায়ক হলেও এতে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে।

এই ঝুঁকি বিবেচনায় বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি ইতিমধ্যে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার কিছু তেলের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে সেগুলোকে পরিশোধনযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। কেননা সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা জামানত জমা দেয়নি।

অপরিশোধিত তেল আমদানি নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, সরবরাহ ঠিক রাখতে বাড়তি দামে হলেও তেল আনা হচ্ছে। মে মাসে আরও একটি অতিরিক্ত চালান আনার চেষ্টা চলছে।