নতুন নীতিমালা

পরিবেশদূষণ করলে এখন সিআইপি হওয়া যাবে না

এফবিসিসিআইয়ের সব পরিচালকই সিআইপি বলে বিবেচিত হবেন। বিদেশিরাও সিআইপি হতে পারবেন। বাড়ানো হয়েছে খাত। 

পরিবেশদূষণের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিরা এখন থেকে আর বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হতে পারবেন না। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পরিবেশদূষণের জন্য দায়ী হয়, সে ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকেরাও সিআইপি হতে পারবেন না।

দণ্ডাদেশপ্রাপ্তির পর পাঁচ বছরের জন্য তাঁদের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা থাকবে। তবে দণ্ডাদেশপ্রাপ্তির পাঁচ বছর পর থেকে আবার তাঁরা সিআইপি হতে পারবেন। একইভাবে অর্থ পাচারের দায়ে দণ্ডিত হলেও কেউ সিআইপি হতে পারবেন না।

নতুন এসব শর্ত আরোপ করে সম্প্রতি সিআইপি (রপ্তানি ও ট্রেড) নীতিমালা ২০২৩ জারি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত ৩০ এপ্রিল থেকে এ নীতিমালা কার্যকর। নতুন নীতিমালা জারির ফলে সিআইপি (রপ্তানি) নীতিমালা ২০১৩ বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া নীতিমালায় পরিবেশদূষণ ও অর্থ পাচারের বিষয়টি ছিল না।

গণহারের পরিবর্তে বরং বেশি রপ্তানি আয় করা ব্যক্তিরা সিআইপি হলেই ভালো হয়। আর পরিবেশদূষণের বিষয়ে যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তা যুগোপযোগী হয়েছে। বিদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকেও অভিনন্দন জানাই।
মো. ফজলুল হক, সাবেক সভাপতি, বিকেএমইএ
‘অনেক দিক বিবেচনায় নতুন নীতিমালাটি করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় খাত বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন বেশি লোক সিআইপি হতে পারবেন। তবে আগের মতো কম রপ্তানি করে সিআইপি হওয়া যাবে না।’
তপন কান্তি ঘোষ, বাণিজ্যসচিব

নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, সিআইপি নির্বাচন করা হবে দুটি শ্রেণিতে। একটি হচ্ছে সিআইপি (রপ্তানি), অন্যটি পদাধিকারবলে সিআইপি (ট্রেড)। পণ্য ও সেবা রপ্তানি আয়ের ভিত্তিতে নির্বাচিত এ সিআইপি মর্যাদা দেওয়া হবে। এত দিন শুধু পণ্য রপ্তানি আয়ের বিপরীতে সিআইপি নির্বাচন করা হতো। নতুন নীতিমালায় সেবা রপ্তানিকেও যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া এত দিন শুধু দেশি রপ্তানিকারকদের সিআইপি মর্যাদা দেওয়া হতো। এখন বিদেশিরাও সিআইপি মর্যাদা পাবেন।

ব্যবসাসংক্রান্ত ভ্রমণে বিমান, রেল, সড়ক ও জলপথে সরকারি যানবাহনে আসন সংরক্ষণ; বিদেশভ্রমণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দূতাবাসকে লেখা চিঠি, সচিবালয়ে প্রবেশ পাস, বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার এবং সরকারি হাসপাতালে পরিবারের সব সদস্যের জন্য কেবিন ইত্যাদি সুবিধা পেয়ে থাকেন সিআইপিরা।

বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক দিক বিবেচনায় নতুন নীতিমালাটি করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় খাত বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন বেশি লোক সিআইপি হতে পারবেন। তবে আগের মতো কম রপ্তানি করে সিআইপি হওয়া যাবে না।’ পরিবেশদূষণ ও অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যাতে সিআইপি হতে না পারেন, সে জন্য প্রথমবারের মতো কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কতজন সিআইপি হতে পারবেন

বাতিল নীতিমালায় বলা ছিল, সিআইপি নির্বাচিত হবেন মোট ১৮৮ জন। এর মধ্যে ৪৮ জন পদাধিকারবলে সিআইপি ট্রেড হিসেবে নির্বাচিত হবেন আর ১৪০ জন হবেন রপ্তানি যোগ্যতা অনুযায়ী।

নতুন নীতিমালায় সিআইপির মোট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সিআইপির (ট্রেড) ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালকেরা সিআইপি হবেন। গত সপ্তাহে জারি হওয়া বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হবেন ৬৮ জন। সেই হিসাবে ৬৮ জনই হবেন সিআইপি।

নতুন নীতিমালায় সিআইপির (রপ্তানি) ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, আয় স্তর অনুযায়ী সংখ্যা নির্ধারিত হবে। যেমন পাঁচ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ পাঁচজন সিআইপি হতে পারবেন। এক কোটি থেকে পাঁচ কোটি ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ সিআইপি হতে পারবেন চারজন। আর এক কোটি ডলারের কম রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ সিআইপি হতে পারবেন তিনজন।

রপ্তানি খাত বেড়ে ২২ থেকে ৩৫

সিআইপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এত দিন পণ্য রপ্তানি খাত ছিল ২২টি। এখন তা বাড়িয়ে ৩৫টি করা হয়েছে। নতুন খাত হিসেবে যুক্ত হয়েছে, ডেনিম ছাড়া সব ধরনের সুতা ও কৃত্রিম তন্তু, ডেনিম ফেব্রিকস ও ডেনিম তৈরি পোশাক, টেরিটাওয়েল, ফুল-ফলিয়েজ, সব ধরনের ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং পণ্য, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ পণ্য, নারী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে রপ্তানি করা পণ্য ও সেবা এবং কম্পিউটার হার্ডওয়্যার।

সেবা খাতের মধ্যে পরামর্শসেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার ও আইসিটি এনাবল সার্ভিসেস, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি এবং বায়িং হাউস, আউটসোর্সিংসহ অন্যান্য সেবা খাতকে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। সফটওয়্যার অবশ্য আগে পণ্য রপ্তানি খাতে ছিল।

রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে হবে

এত দিন কৃষিজাত ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য, ওষুধ, প্লাস্টিকজাত পণ্য, মেলামাইন, কম্পিউটার সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে রপ্তানির পরিমাণ কমপক্ষে দেড় লাখ মার্কিন ডলার হতে হবে বলে শর্ত ছিল। অন্য খাতগুলোর ক্ষেত্রে রপ্তানি শর্ত ছিল কমপক্ষে ১৫ লাখ ডলারের। নতুন নীতিমালায় খাতভিত্তিক ন্যূনতম রপ্তানির পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হয়েছে সর্বনিম্ন ১০ লাখ ডলার, আর সর্বোচ্চ সাত কোটি ডলার।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণহারের পরিবর্তে বরং বেশি রপ্তানি আয় করা ব্যক্তিরা সিআইপি হলেই ভালো হয়। আর পরিবেশদূষণের বিষয়ে যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তা যুগোপযোগী হয়েছে। বিদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকেও অভিনন্দন জানাই।’

কারা সিআইপি হতে পারবেন না

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণখেলাপি ও করখেলাপিরা সিআইপি হতে পারবেন না। সিআইপি হওয়ার আবেদনপত্রের সঙ্গে ‘বকেয়া নেই’ মর্মে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

আগেও এ নিয়ম ছিল। নতুন করে অর্থ পাচারের মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্যাডে অর্থ পাচারের মামলা নেই এবং ঋণখেলাপি নয় বলে ঘোষণাপত্র সংযোজন করতে হবে।