কোনো ধরনের কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন করার সুযোগ না রেখে নিঃশর্ত ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে সরকার আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কালোটাকা সাদা করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে—গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন সংবাদে গভীর হতাশা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ বৃহস্পতিবার এ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে টিআইবি।
টিআইবি বলছে, আবাসন খাত ব্যবসায় স্থবিরতা দূর, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অজুহাতে এ জাতীয় দুর্নীতিসহায়ক সুযোগ প্রদান সরকারের জন্য আত্মঘাতমূলক; যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করারই নামান্তর। এই সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
একই সঙ্গে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর যে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করার আহ্বান জানাচ্ছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর প্রায় প্রতিটি সরকার কোনো না কোনো পন্থা অবলম্বন করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার নামে সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ পরিপন্থী এই বিধান অব্যাহত রেখেছে। এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয় বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে। তিনি বলেন, কখনো বিনা প্রশ্নে, আবার কখনো নিয়মিত করহারের চেয়ে তুলনামূলক কম হারে দুর্নীতিবাজদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক এই অনৈতিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছিল। এর ফলে দেশে কর ফাঁকি এবং সৎ ও বৈধ আয়ের ব্যক্তি করদাতাকে নিরুৎসাহিত করার সংস্কৃতি ক্রমান্বয়ে দৃঢ়তর হয়েছে।’
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কালোটাকা সাদা করার বিধান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন ধাপে বন্ধ করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের সেটি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে পড়ার মতো। কারণ, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ারই শামিল; যা বর্তমান সরকারকে বিতর্কিত করার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকার করে বিপুল জনরায়ে নির্বাচিত সরকারের এই অনৈতিক ও আত্মঘাতী চর্চা পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে কী বার্তা দিতে চাচ্ছেন? এ ক্ষেত্রে সরকারকে স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী শ্রেণির চেয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বিবেচনাসহ জন-আকাঙ্ক্ষা মূল্যায়নে আন্তরিক হওয়া জরুরি।
টিআইবি বলছে, জাতীয় জুলাই সনদের ৬৭ ধারায় ব্যক্তির অনুপার্জিত আয় ভোগ করার সুযোগ বন্ধের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল ও জোট সর্বসম্মতভাবে অঙ্গীকার করেছে। এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারসহ দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করবে না—এমন অঙ্গীকার করেছে। অথচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, আবাসন খাতের লবির প্রভাবে আসন্ন বাজেটে দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অন্য যেকোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার কোনো ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ না রেখে ‘পরিপূর্ণ দায়মুক্তি’ দেওয়ার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বারবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েও রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়নি; বরং মানুষকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে অনিয়ম-দুর্নীতিকে সরকার সুরক্ষা ও প্রশ্রয় দিচ্ছে।’
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিদেশ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থ ফেরত আনার আন্তরিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকার যদি এই পরিকল্পনা করে থাকে, সেটা হতে পারে। তবে যাঁরা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা যেন এ সুযোগ নিতে না পারেন। তাঁদের জন্য কোনো বিবেচনায়ই সাধারণ ক্ষমা প্রযোজ্য নয়, তা সরকারে নিশ্চিত করতে হবে।