বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জনপ্রিয় সংস্কৃতির তেমন একটা সম্পর্ক দেখা যায় না। ইলন মাস্ক তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম। উচ্চাভিলাষী এই উদ্যোক্তা শুধু ইন্টারনেট–সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় চরিত্রই নন, বিপুল সম্পদের মালিক হিসেবেও তিনি আলোচনার শীর্ষে। তাঁর সম্পদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তিনি এখন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা লাখ কোটি ডলারের মালিক।
বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ যখন বাড়ছে এবং অতি ধনীদের প্রতি জনমনে বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে, তখন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও ইলন মাস্ক জনপ্রিয়। ওয়ারেন বাফেটের মতো ব্যবসায়ীরা সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন। মাস্কের সে ধরনের ব্যক্তিত্ব না থাকলেও তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট।
ভক্তরা মনে করেন, খোলামেলা ও সংযমহীন কথা বলার প্রবণতাই মাস্কের প্রতি মানুষের আকর্ষণের মূল কারণ। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, অতি ধনীদের মতো তিনিও ক্ষমতার ব্যবহার করেন। তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, একই সঙ্গে রাজনীতিতে তাঁর ক্রমবর্ধমান পক্ষপাতমূলক হস্তক্ষেপও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তারপরও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু স্পেসএক্স-রকেট, স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠান গতকাল প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) মাধ্যমে রেকর্ড ৭৫ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলার পাশাপাশি স্পেসএক্সই তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি। স্পেসএক্সের আইপিও বাজারে আসার আগে ফোর্বসের হিসাবে মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৮০ বিলিয়ন বা ৭৮ হাজার কোটি ডলার। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালফাবেটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের সম্পদের তুলনায় যা অনেক বেশি।
ফোর্বস ওয়েলথের উপসম্পাদক ম্যাট ডুরোট বলেন, ‘দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তির সম্পদ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে। অর্থাৎ মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন ছাড়া আর কেউ কখনো ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হননি।’
বর্তমানে মাস্কের সম্পদের বড় অংশই স্পেসএক্সে। সেখানে তাঁর অংশীদারির বাজারমূল্য প্রায় ৮৬৬ বিলিয়ন বা ৮৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, টেসলা ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে শুক্রবার শেয়ার লেনদেন শুরু হলে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এই হিসাবের মধ্যে অবশ্য ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে হস্তান্তরযোগ্য শেয়ারও অন্তর্ভুক্ত আছে।
টেসলা ও স্পেসএক্সের মাধ্যমে মাস্ক বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। পরে ২০২২ সালে ৪৪ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটার (বর্তমান এক্স) কেনেন তিনি। এর মাধ্যমে তাঁর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। এরপর তিনি ধাপে ধাপে রাজনীতি, অভিবাসন, সরকারি ব্যয় ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়ে অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।
রাজনীতিতে মাস্কের প্রবেশ, বিশেষ করে গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’(ডিওজিই)-তে ভূমিকা পালন, ছিল তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত পদক্ষেপগুলোর একটি। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তিনি নিজেও ট্রাম্পের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। ফলে ২০২৫ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে টেসলার বিক্রি কমে যায়। এমনকি টেসলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। ভোক্তারা এই গাড়ি বয়কটও করে।
ইলন প্রিমিয়াম
৫৪ বছর বয়সী ইলন মাস্ক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন কানাডীয়, বাবা দক্ষিণ আফ্রিকান। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
২০০৮ সালে টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মাস্ক বিশ্বাস করতেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, উচ্চ কর্মক্ষমতা ও সফটওয়্যারনির্ভর সুবিধাও দিতে পারে। তাঁর নেতৃত্বে টেসলা বৈশ্বিক গাড়িশিল্পে নতুন ধারা তৈরি করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, টেসলার সাফল্য ও ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্যের কারণে পুরোনো তেলচালিত গাড়ি কোম্পানিগুলোও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও মাস্ক একই ধরনের সাফল্য দেখাতে পারবেন। তবে স্পেসএক্স এখনো মূলধননির্ভর প্রতিষ্ঠান, এর বাজারমূল্যের বড় অংশ নির্ভর করছে এমন সব প্রযুক্তির ওপর, যেগুলোর বাণিজ্যিক সফলতা পেতে আরও বহু বছর, এমনকি কয়েক দশকও লাগতে পারে।
টেসলা ও স্পেসএক্স ছাড়াও মাস্ক আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা। এর মধ্যে আছে ভূগর্ভস্থ টানেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান দ্য বোরিং কোম্পানি এবং মস্তিষ্কের চিপ প্রতিস্থাপন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা নিউরালিংক।
টেসলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে মাস্ক যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি বিতর্কিতও করেছেন। একসময় অনেক প্রতিষ্ঠিত গাড়ি কোম্পানি মনে করত, কোনো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে ব্যাপক পরিসরে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন করতে পারবে না।
জেনারেল মোটরসের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বব লুটজ বলেন, অটোমোটিভ প্রকৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী সক্ষমতার বিষয়ে সারা বিশ্বের যে মনোভাব, সেটা মাস্কের কল্যাণে আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে।
তবে একই সময়ে টেসলা নানা আইনি জটিলতা এবং শেয়ারহোল্ডারদের উদ্বেগের মুখোমুখিও হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে মাস্কের জন্য অনুমোদিত প্রায় ৫৬ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পারিশ্রমিক ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
মাস্কের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে বাজার বিশ্লেষকেরা তাঁর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ককে ‘মাস্কোনমি’ নামে অভিহিত করছেন। এই প্রভাব থেকেই ‘ইলন প্রিমিয়ামের’ ধারণা জন্ম নিয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস, এই বাড়তি মূল্যায়ন মূলত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সূচকের কারণে নয়; বরং মাস্কের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাঁর সাফল্য অর্জনের সক্ষমতার ওপর আস্থার প্রতিফলন।
আইপিওবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ ক্যাপিটালের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ম্যাট কেনেডি বলেন, টেসলার মতোই স্পেসএক্স মূলত ইলন মাস্কের ওপর বাজি ধরার শামিল।
ম্যাট আরও বলেন, ‘যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এটাকে বরং “ইলন মাস্ক প্রিমিয়াম” বলাই যথাযথ হয়।’
ফিল্টারহীন ইলন
মাস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব করপোরেট শাসনব্যবস্থা, স্বার্থের সংঘাত ও তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাগ্য একজন ব্যক্তির সঙ্গে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ছে, সেই প্রশ্ন আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
বছরের পর বছর ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিলিয়নিয়ার, শর্ট সেলার, সাংবাদিক, রয়টার্স ও বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ অনেকের সঙ্গে মাস্কের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা গেছে। এসব দ্বন্দ্বের বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ঘটেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর জুটিও সেই ধারার অংশ ছিল। ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পেছনে অর্থায়ন করার পর মাস্ক ট্রাম্প প্রশাসনের ডিওজিই উদ্যোগে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
তবে নীতিনির্ধারণ ও সরকারি ব্যয় নিয়ে মতবিরোধের কারণে পরে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তা প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নেয়। যদিও পরে দুজনই তুলনামূলক সমঝোতার সুরে কথা বলেছেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকার সীমারেখা কতটা অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবু অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে মাস্কের অপ্রচলিত আচরণ নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে তাঁর সাফল্যের ইতিহাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বারবার দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী ধারণাকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে।
সম্প্রতি মাস্কের সঙ্গে এক আলোচনায় জেপিমরগান চেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমি ডাইমন বলেন, ‘ইলন আমাদের সময়ের এডিসন।’
একসময় দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে মাস্কের প্রতিপক্ষ এই ব্যাংকার পরবর্তীকালে মাস্কের ভক্ত হয়ে ওঠেন। গত বছর সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডাইমন বলেন, তাঁদের মধ্যে বিরোধ মিটে গেছে। একই সঙ্গে তিনি মাস্ককে ‘আমাদের সময়ের আইনস্টাইন’ হিসেবে আখ্যা দেন।