
একসময় বাংলাদেশের জন্য নমনীয় ঋণ বা সস্তা ঋণের বড় উৎস ছিল জাপান। পাঁচ বছর আগেই জাপানের ঋণে গড় সুদহার ছিল ১ শতাংশের কম। এখন এই সুদহার বেড়ে এখন ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
চলতি বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার আরও বেড়ে সাড়ে ৩ শতাংশ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই জাপান এখন আর সস্তা ঋণের বড় উৎস কি না, তা নিয়েই ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান নিয়ে কাজ করা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারাও বলছেন, জাপান এখন আর সস্তা ঋণের বড় উৎস নেই। অর্থনীতিবিদেরাও একই কথা বলছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, জাপানের ঋণের সুদহার বৃদ্ধির কারণে সরকারের দায়দেনা পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। তাই সময় এসেছে বিকল্প অর্থায়নের উৎস সন্ধান করার।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন বৈশ্বিক ঋণের বাজার কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই ঋণের জন্য নতুন উৎস খোঁজা দরকার। যাতে একক নির্ভরতা তৈরি না হয়। এমন উৎস খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে ঋণের জন্য দর-কষাকষি সুযোগ থাকবে। এ ছাড়া ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলও বদলাতে হবে।
৫ বছরে সুদহার বাড়ল কত
ইআরডি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের ৮টি প্রকল্পে জাপান থেকে ঋণ নেওয়া হয়। তার মধ্যে ৭টি ঋণচুক্তিই হয়েছিল দশমিক ৬ শতাংশ সুদে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ছিল যমুনা রেলব্রিজ নির্মাণ, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও এমআরটি উত্তর লাইন-৫ প্রকল্প।
২০২১ সালে এসে একই সুদহারে জাপানের সঙ্গে আরও দুটি চুক্তি হয়। কিন্তু ২০২২ সালে সুদহার বেড়ে দশমিক ৭ হয়। ২০২৩ সালে আরও বেড়ে সুদের হার হয়ে যায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। আর গত বছর জাপানের ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়ায় ২ শতাংশে।
সর্বশেষ চলতি বছরের জুনে জাপান থেকে ৩১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়। সেখানে সুদের হার ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। অবশ্য বাজেট সহায়তার সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
সুদের হার বেশি হলেই ঋণ ব্যয়বহুল, তা পুরোপুরি বলা যাবে না। কারণ, ঋণ ব্যয়বহুল কি না, তা শুধু সুদের হার দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। ঋণ ব্যয়বহুল কি না, তা নির্ধারণ করতে ঋণের সুদ ও আসল কত বছরে পরিশোধ করা হচ্ছে– এসব বিবেচনা করা হয়। কাজের মান কেমন– তাও দেখা হয়।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, এখন যেকোনো প্রকল্পে জাপান থেকে ঋণ নিতে এ হারে (৩ দশমিক ০৫ শতাংশ) সুদ দিতে হবে। এমনকি বছর শেষে এ সুদের হার আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন ইআরডি কর্মকর্তারা। কারণ, প্রতি ৬ মাস পরপর সুদের হার পর্যালোচনা করছে জাপান।
ইআরডির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পর জাপান বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম ঋণের উৎস। দেশটি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পর্যন্ত মোট প্রায় ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ, যার প্রায় ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলার নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ হিসেবে।
কেন বাড়ছে সুদের হার
ইআরডি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) অন্যান্য সব ঋণদাতা সংস্থার তুলনায় এখন জাপানের ঋণের সুদের হার সবচেয়ে বেশি। জাপানের অর্থনীতির শক্ত অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ায় দেশটি ঋণের সুদের হার ধাপে ধাপে বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন ইআরডির কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, জাপান আঞ্চলিক সব দেশের জন্যই ঋণের সুদের হার বাড়াচ্ছে। মূল্যস্ফীতির কারণ দেশটিতে সুদের হার বাড়ছে। সে জন্য বিদেশি সহায়তার ক্ষেত্রেও তারা সুদহার বাড়াচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে জাপান থেকে ঋণের নেওয়ার যৌক্তিকতা কিংবা জাপানের বিকল্প নিয়ে চিন্তিত ইআরডি কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানান, সেপ্টেম্বরে নতুন করে আবার সুদহার পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা)। এ সংস্থার মাধ্যমেই ঋণ দিয়ে থাকে জাপান।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাথাপিছু আয় হিসেব করে উন্নয়ন সহযোগীরা সুদের হার বাড়াচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা বা এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের পর থেকে ঋণদাতা সংস্থাগুলো সুদহার বাড়াচ্ছে। তাই ঋণের সুবিধা ঠিকমতো আসছে কি না, সেটাও এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
সুবিধা–অসুবিধা কী
সুদের হার বেশি হলেই ঋণ ব্যয়বহুল, তা পুরোপুরি বলা যাবে না। কারণ, ঋণ ব্যয়বহুল কি না, তা শুধু সুদের হার দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। ঋণ ব্যয়বহুল কি না, তা নির্ধারণ করতে ঋণের সুদ ও আসল কত বছরে পরিশোধ করা হচ্ছে– এসব বিবেচনা করা হয়।
সাধারণত কোনো একটি দেশ থেকে ঋণ নিলে তা অনেকটা স্লাপাইয়ার্স ক্রেডিট বা সরবরাহকারী ঋণ হিসেবে পরিচিত। যে দেশ থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, সেখানকার ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগ, পণ্য কেনাসহ নানা ধরনের শর্ত থাকে। এ ছাড়া কোন দেশের ঋণ নিয়ে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তাদের ঠিকাদারের কাজের মান কেমন– তাও বিবেচনায় রাখতে হয়।
জাপানের ঋণে প্রকল্প করলে সাধারণত জাপানের ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগ দিতে হয়। জাপানের কাজের মান অন্যান্য ঋণদাতা দেশের তুলনায় ভালো– এমন কথা প্রচলিত আছে।
এখন বৈশ্বিক ঋণের বাজার কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই ঋণের জন্য নতুন উৎস খোঁজা দরকার। যাতে একক নির্ভরতা তৈরি না হয়। এমন উৎস খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে ঋণের জন্য দর-কষাকষি সুযোগ থাকবে– মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
ইআরডি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদহার বাড়লেও জাপানের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ গড়ে ৩০ বছরের বেশি। তাই অন্য কোনো দ্বিপক্ষীয় ঋণ গ্রহণের চেয়ে জাপানের ঋণের প্রতি আগ্রহ বেশি। ৩০ বছরে ঋণের সুদাসল পরিশোধ করলে ঋণ শোধের কিস্তি কমে যায়। এমনকি জাপান ঋণ মওকুফ তহবিলের (জেডিসিএফ) মাধ্যমে সুদের একটি অংশ পরিশোধ না করে আবার অন্য প্রকল্পে ব্যবহার করা যায়। এ দেশে এই চর্চা দীর্ঘদিন ধরে আসছে।
অন্যদিকে চীন ভারত থেকে ১ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও ঋণ পরিশোধে সময় পাওয়া যায় ১০ থেকে ১৫ বছর। ফলে দ্রুত ঋণ পরিশোধের চাপ থাকে।
প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে
এদিকে, সুদের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি প্রথমে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়। কিন্তু পরে সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এখন আবার তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ২২ হাজার ২৬৭ কোটি করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এখন সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এখন ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাব করেছে জাইকা।
বিকল্প উৎস কী
প্রচলিত উৎস থেকে ঋণের সুদ বাড়তে থাকায় সরকারকে ঋণের বিকল্প উৎস খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও কয়েকটি অনুষ্ঠানে ঋণের বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণের বিকল্প উৎস হিসেবে বিদেশি ইকুইটি, বন্ড মার্কেট ও কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধাগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে কাজ করছি। তা ছাড়া পুঁজিবাজার ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ বা অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি নিয়েও সরকার কাজ করছে।’
তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না করতে পারলে বিকল্প উৎস থেকেও ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘বিদেশি অর্থায়ন পেতে দেশীয় বন্ড ও পুঁজিবাজার উন্নত করতে হবে। দেশ যেন ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সে জন্য এখন অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।