অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণে বড় বাধা ভঙ্গুর ব্যাংক খাত

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের উচ্চাভিলাষী এক বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আরও বলেছেন, এখন থেকে দেশের অর্থনীতি হবে বিনিয়োগনির্ভর। কেননা, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলার করা, যা এখন আছে এর ঠিক অর্ধেক।

তবে এর কোনো লক্ষ্যই পূরণ হবে না, যদি দেশের ব্যাংক খাত গভীর সংকটে ও ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে। কেননা, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুরোপুরিই ব্যাংক খাতনির্ভর। ব্যাংক খাতের সম্পদ দেশের মোট জিডিপির ৫০ শতাংশ। এই সম্পদের ৮৫ শতাংশই ঋণ ও বিনিয়োগ। এমনকি সরকারও নির্ভর করে ব্যাংক খাতের ওপর। এবার অর্থমন্ত্রী যে বাজেট ঘাটতি করেছেন, তার ৪৬ শতাংশ অর্থই আসবে ব্যাংক খাত থেকে।

দেশের এই ব্যাংক খাতের করুণ চিত্র অর্থমন্ত্রীই বাজেটে তুলে ধরেছেন। যেমন: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অবশ্য বাজেট পেশের সময় এই হার আরও কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। আর এখন মোট জিডিপিতে বেসরকারি ঋণ মাত্র ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এর মধ্যে আবার ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে ব্যাংক খাতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতকে ঠিক করার কাজটি এখনই না করলে অর্থমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী প্রথম বছর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং পরের তিন বছরে উত্তরণ সম্ভব হবে না।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলার করা, যা এখন আছে এর ঠিক অর্ধেক।

দুর্বল ব্যাংকে ক্ষতি সবার

ব্যাংক

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে জাপানের ব্যাংকগুলো শেয়ার ও জমিতে অতিরিক্ত ঋণ দিয়েছিল। এর মূল্য কমে গেলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে বিনিয়োগ কমে যায়। এতে জাপানে দীর্ঘ অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়, এখনো যাকে বলা হয় হারানো দশক বা ‘লস্ট ডিকেড’।

বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের সংকট আসলে একটি দেশের পুরো অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দুই অর্থনীতিবিদ লুক লেভেন ও ফাবিয়ান ভ্যালেন্সিয়া ১৯৭০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বের ১৫১টি ব্যাংকিং সংকট নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সেই গবেষণায় বলা হয়, কোনো দেশে মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেলে বা ব্যাংক খাত বাঁচাতে সরকারের ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে সেটি গুরুতর সংকটের লক্ষণ। এর সঙ্গে যদি আমানত স্থগিত করা, ব্যাংক জাতীয়করণ, বিশেষ তারল্য সহায়তা বা সরকারি গ্যারান্টির মতো পদক্ষেপ নিতে হয়, তাহলে সেটিকে পদ্ধতিগত ব্যাংকিং সংকট হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই ব্যাংকিং সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের। ফলে কর্মসংস্থান কমে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে পারে।

লেভেন ও ভ্যালেন্সিয়ার গবেষণায় আরও দেখা গেছে, একটি ব্যাংকিং সংকট শুরু হওয়ার পর গড়ে প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশ সমপরিমাণ উৎপাদন ক্ষতি হয়। আবার ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলার খরচও বিশাল। সংকট সামাল দিতে সরকারকে গড়ে জিডিপির ৮ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করতে হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গড়ে মোট আমানতের প্রায় ১৭ শতাংশ সমপরিমাণ তারল্য সহায়তা দিয়েছে।

ব্যাংকিং সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের। ফলে কর্মসংস্থান কমে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে পারে।

বাংলাদেশেও একই চিত্র

গুরুতর সংকটের যে সংজ্ঞা গবেষকেরা দিয়েছেন, তার প্রতিটিই বাংলাদেশে ঘটছে। সরকারি হিসাবেই এখন বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিতে হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ আমল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্যন্ত টাকা ছাপিয়ে ১২টি ব্যাংককে ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলের সর্বশেষ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সময় দেওয়া হয় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময় দেওয়া হয় ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ তিন মাসের জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে বছর পার হয়ে গেলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। আর পাঁচ ইসলামি ধারার ব্যাংক একীভূত করার জন্য সরকারকে আরও দিতে হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এই পাঁচ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ঠিক করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর বাজেটে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরেই ব্যাংক খাতের মূলধন-সংকট কাটাতে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার পর ইসলামী ব্যাংক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াতমুক্ত করার অংশ হিসেবে এর মালিকানা দখলে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তায় মালিকানা দখলে নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এস আলম।

ব্যাংক খাতে নতুন সংকট

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের সংস্কারে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাব ছিল মিশ্র। এর মধ্যে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে একটি সরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এর সফলতা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের পরিস্থিতি উন্নতির দিকেই ছিল। বাড়ছিল আমানত। সহায়তা দিতে হলেও তা ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করেছে।

প্রতিষ্ঠার পর ইসলামী ব্যাংক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াতমুক্ত করার অংশ হিসেবে এর মালিকানা দখলে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তায় মালিকানা দখলে নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এস আলম। এরপর তিনি কৌশল করে একে একে সাতটি ব্যাংক দখল করেন। তারপর নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিলে ব্যাংকগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।

নির্বাচনের পর সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন পাস করার সময় পুরোনো মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরত দেওয়ার ধারা যুক্ত করলে বিভ্রান্তি ও এর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। পরে ব্যাংকটির শীর্ষ পদে পদত্যাগ ও নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকটি নিয়ে আবার রাজনৈতিক টানাপোড়েনও শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে একটি পক্ষ নিয়েছে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচনের সময় ইসলামী ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এতে আস্থা হারিয়ে অনেক গ্রাহক যেমন আমানত তুলে নিচ্ছেন, তেমনি চাপে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবেও অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নতুন করে ১০ হাজার কোটি টাকা অর্থ সহায়তা চেয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গত শুক্রবার বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আশ্বস্ত করেছেন যে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা অর্থ পাবেন। এ জন্য তারল্য সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তারল্য সহায়তা দিয়ে সাময়িক সংকট মেটানো গেলেও প্রয়োজন চূড়ান্ত সমাধান। এ জন্য সবার আগে রাজনীতি থেকে ব্যাংককে দূরে রাখতে হবে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে বলেছেন, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে। এখন তা কার্যকর করাই হবে তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এ অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নতুন করে ১০ হাজার কোটি টাকা অর্থ সহায়তা চেয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গত শুক্রবার বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আশ্বস্ত করেছেন যে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা অর্থ পাবেন। এ জন্য তারল্য সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

কেন ব্যবস্থা নিতে হবে

বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে আলাদা বিশ্লেষণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। সেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক হচ্ছে দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। এসব সরকারি ব্যাংক দেশের মোট ব্যাংক খাতের সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশ। সুতরাং এসব ব্যাংকের স্থিতিশীলতা পুরো আর্থিক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ হিসাবে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৬ শতাংশ।

বেসরকারি খাতের মধ্যে ১১টি ব্যাংক ছিল চরম দুর্দশায়। এর মধ্যে কয়েকটির পরিস্থিতি ভালো হলেও বেশির ভাগই এখনো খারাপ অবস্থায়। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংককে টিকিয়ে রেখেছে সরকার। একসময়ের সরকারি মালিকানাধীন সবচেয়ে ভালো ব্যাংক বেসিক ব্যাংক আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা কেউ মনে করেন না।

অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি খাতের ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ একাই মোট ব্যাংকিং খাতের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। এই সম্পদ জিডিপির প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। সুতরাং এই দুই ধরনের ব্যাংককে দ্রুত ঠিক করতে না পারলে অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাতে সংকট পুরো ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়বে। এমন আশঙ্কার কথা এরই মধ্যে জানিয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)।

বেসরকারি খাতের মধ্যে ১১টি ব্যাংক ছিল চরম দুর্দশায়। এর মধ্যে কয়েকটির পরিস্থিতি ভালো হলেও বেশির ভাগই এখনো খারাপ অবস্থায়। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংককে টিকিয়ে রেখেছে সরকার। একসময়ের সরকারি মালিকানাধীন সবচেয়ে ভালো ব্যাংক বেসিক ব্যাংক আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা কেউ মনে করেন না।

যত দেরি, তত বেশি সংকট

আইএমএফের সাবেক ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ ডেভিড হোলশার এবং সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর স্টেফান ইংভেস ২০ বছর আগে এক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, ব্যাংকিং সংকট যত দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সংকট মোকাবিলার ব্যয় তত কম হয়। দেরি হলে ক্ষতি বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ব্যয়ও বেড়ে যায়।

বিশ্বব্যাংক সেই গবেষণার কথা উল্লেখ করে ২০২৫ সালের রিপোর্টে বলেছে, হস্তক্ষেপে বিলম্ব হলে আর্থিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে এবং সমাধানের ব্যয় বেড়ে যাবে। কারণ, গভীর সংকটে পড়া ব্যাংক খুব কম ক্ষেত্রেই নিজের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করতে সংস্কারের বিকল্প নেই। সেই সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে। এতে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংক খাত অপরিহার্য। এ জন্য ব্যাংক খাত ঠিক না হলে অর্থনীতিও ঠিক হবে না। এই সমস্যার যত দ্রুত সমাধান করা যাবে, অর্থনীতির জন্য ততই ভালো হবে। সমস্যা দিনে দিনে ঘনীভূত হচ্ছে, যা পুরো খাতের জন্য অশনিসংকেত।

মোস্তফা কে মুজেরী আরও বলেন, ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করতে সংস্কারের বিকল্প নেই। সেই সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে। এতে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না। ব্যাংক খাতের এই পরিণতির পেছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দায়ী। টেকসই সমাধানের জন্য দক্ষ, যোগ্য ও নির্মোহ ব্যক্তিদের দিয়ে ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে। সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে পেশাদার ও নিরপেক্ষ আচরণ করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্যাংক সংস্কার কমিশন কবে হবে

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপির দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। ইশতেহারে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। এমনকি নতুন বাজেটেও এর প্রতিফলন আছে। তবে ব্যাংক খাত নিয়ে সংস্কার কমিশন গঠনের কথা ইশতেহারে থাকলেও বাজেটে এর কোনো উল্লেখ নেই। অর্থমন্ত্রী আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে সামান্য কিছু কথা বলেছেন, তবে ব্যাংক সংস্কারের কোনো কাঠামো বা সময়সীমার উল্লেখ করেননি। ইশতেহারে বলা ছিল, বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, করপোরেট নেতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। এ ছাড়া ইশতেহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক পরিচালনা ও তদারকির ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করার কথাও বলা ছিল।

বাংলাদেশে সর্বশেষ ব্যাংক সংস্কার কমিটি বা কমিশন গঠন হয়েছিল ৩০ বছর আগে, ১৯৯৬ সালে। অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এর প্রধান ছিলেন। এরপর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় ব্যাংক কমিশনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এরপর ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে আবারও ব্যাংক কমিশন গঠনের কথা বলেন পরবর্তী অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাধায় সেই কমিশন আর হয়নি। তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

এখন নতুন সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করবে, নাকি পিছিয়ে যাবে—সেটাই দেখার বিষয়।

যা করতে হবে

বিশ্বব্যাংক তাদের রিপোর্টে ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ১০ ধরনের সুপারিশ করেছিল। যেমন

  • ব্যাংক পুনর্গঠন কাঠামো শক্তিশালী করা

  • আমানত সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা

  • ব্যাংকে সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা

  • রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক সংস্কার

  • শক্তিশালী খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা

  • পূর্ণাঙ্গ দেউলিয়াত্ব ও অবসায়ন আইন প্রণয়ন

  • ব্যাংকিং বিধিবিধানের কঠোর প্রয়োগ ও তদারকি জোরদার করা

  • জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা

  • আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করা

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা জোরদার করা

এখন নতুন সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করবে, নাকি পিছিয়ে যাবে—সেটাই দেখার বিষয়।