অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ কৃষি বিপণন অধিদপ্তর হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। প্রায় দেড় বছর পর সেই ভাড়া ৭৫ পয়সা কমিয়ে ৬ টাকা করা হয়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তে দেশের হিমাগারের মালিকেরা আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ভাড়া কমানোর ফলে হিমাগারের মালিকদের সম্ভাব্য আয় কমবে প্রায় ১৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এতে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সমস্যা হবে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে অনেক হিমাগার।
গত ৩০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের ভাড়ার হার প্রতি কেজিতে ৭৫ পয়সা কমিয়ে ৬ টাকা নির্ধারণ করে। কৃষিসচিব সেলিম খানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরদিন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গত ৩১ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, ‘দেশের বিভিন্ন বেসরকারি কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণে সর্বোচ্চ ভাড়ার সীমা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি কেজি ৬ টাকা হারে নির্ধারণ করা হলো।’
জানতে চাইলে কৃষিসচিব সেলিম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতি কেজি আলু হিমাগারে রাখার ভাড়া কত হওয়া যৌক্তিক, তা জানতে ২৫ জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নিয়ে কমিটি করা হয়েছিল। কমিটি ৫ টাকা ৫০ পয়সা সুপারিশ করেছে। কৃষকদের বুঝিয়ে আমরা ৬ টাকা ঠিক করেছি।’
কৃষিসচিব আরও জানান, হিমাগারের মালিকদের প্রথম দাবি ছিল ৬ টাকা ৩৮ পয়সা। পরবর্তীকালে তাঁরা ৬ টাকা ১০ পয়সা দাবি করেছিল। কিন্তু কৃষকেরা এখন লোকসান দিয়ে আলু বিক্রি করছেন।
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ৬ সেপ্টেম্বর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে আবেদন করেছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের কাছে আলাদা আবেদন করেছে।
জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের আবেদন আমরা দেখব। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত আবেদনে জানানো হয়, বর্তমানে হিমাগারগুলোতে ২৩ লাখ টনের বেশি আলু সংরক্ষিত আছে। এই বিপুল পরিমাণ আলুর ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা ভাড়া কমানোর ফলে হিমাগারের মালিকদের আয় কমে যাবে প্রায় ১৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এতে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সমস্যা হবে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে অনেক হিমাগার।
আরও জানানো হয়, সরকার গত ১ জুন বিদ্যুতের বাণিজ্যিক হার বাড়িয়েছে ১৮ শতাংশ। সে কারণে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ৮ জুন কৃষি মন্ত্রণালয়কে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া বৃদ্ধি; অর্থাৎ সমন্বয়ের দাবি জানায়। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। উল্টো হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা কমিয়ে দিয়েছে।
হিমাগারের মালিকদের সংগঠনটি আরও বলেছে, হিমাগারশিল্পে বিনিয়োগের বড় অংশই ব্যাংকঋণনির্ভর। ভাড়া কমে যাওয়ায় মালিকেরা ঋণের কিস্তি ও সুদ যথাযথভাবে পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে তাঁদের ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
মুন্সিগঞ্জ জেলা আলু চাষি সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে জানান, এত দিন অনেক হিমাগার বেশি ভাড়া নিয়ে আসছিল—এখন তা যৌক্তিক পর্যায়ে এসেছে। আর ১৭২ কোটি টাকা লোকসানের হিসাবে গরমিল আছে। নির্ধারিত দর ৬ টাকা ৭৫ পয়সা থাকলেও বাস্তবতা বিবেচনায় মুন্সিগঞ্জের ৬২টি হিমাগার এত দিন ৫ টাকা ৫০ পয়সা দরেই আলু সংরক্ষণ করে আসছিল।
দেলোয়ার হোসেন আরও জানান, ‘আমাদের জানা মতে, প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের খরচ ২ টাকা ৫০ পয়সার বেশি নয়।’
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন হাত ঘুরে বর্তমানে দেশের খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় আলু বিক্রি হচ্ছে। এ আলু কৃষক বিক্রি করছেন ১৪ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। দেশে বার্ষিক আলুর চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন।
উদ্বৃত্ত আলুর একাংশ রপ্তানি করা গেলে দেশের বাজারে সরবরাহের চাপ কমতে পারে। কৃষকেরাও ভালো দাম পেতে পারেন। সে জন্য ব্যবসায়ীরা সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ১১তম ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিট ২০২৬ ’-এর দ্বিতীয় দিন গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির শ্রীলঙ্কার বাণিজ্য, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, খাদ্যনিরাপত্তা ও সমবায় উন্নয়নমন্ত্রী ওয়াসান্থা সামারাসিংহের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছ, ওই বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে আলু ও পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করে শ্রীলঙ্কা। শিগগিরই শ্রীলঙ্কার বাজারে আলু রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করতে বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠাবে বাংলাদেশ।