উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর অবশেষে নীতি সুদহারের বাঁধন কিছুটা আলগা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে। তাতে ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমার সুযোগও তৈরি হতে পারে। আর ঋণের সুদ কমলে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অবলম্বন করে আসছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তারপর মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে আসেনি। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে নীতি সুদহার কমানোয় মূল্যস্ফীতির ওপর তার কী প্রভাব, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছুটা সতর্কতা রয়েছে। তাঁরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে মানুষের প্রকৃত আয় কমবে। এতে ভোগব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—সবকিছুই চাপে পড়বে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। আগামী রোববার থেকে নতুন নীতি সুদহার কার্যকর হবে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের সুদের হার কমলে ঋণের প্রবাহ বাড়তে পারে। এতে অর্থের সরবরাহ বাড়লে নতুন করে মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে। বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণের সুদ কমাতে এই উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু নতুন ও সম্প্রসারণের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদহার একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতা, করনীতি, ঘুষ-দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি—এসব বিষয়ও জড়িত থাকে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে সুদহার কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
মো. মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়ে নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন। তবে সে সময় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সেখান থেকে সরে আসেন। এরপর গত ৩০ জুন চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদহারে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ দেয়, সেটাই হচ্ছে নীতি সুদহার। ইংরেজিতে বলে রেপো রেট। এটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রানীতির একটি অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত।
জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, এমনিতেই সুদহার কমে আসছিল। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ কমানোর ফলে আরও কমে আসবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থে এটা কমানো হয়েছে। ফলে আমানতের সুদও কমবে। কোনো ব্যাংকের ঋণের সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ, কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
বিনিয়োগ কতটা বাড়বে
উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে শ্লথগতি রয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে নীতি সুদহার কমানোয় বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে, এমনটাই বললেন একাধিক উদ্যোক্তা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে। এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় মুনাফা করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া নতুন বিনিয়োগ ব্যাংক ঋণের সুদহার ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রাপ্তি, রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে ব্যবসা সহজ করার বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে ব্যাংকঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ কাজে দেবে।
উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এদিকে নতুন বিনিয়োগেও আশাব্যঞ্জক তথ্য নেই। বিদায়ী অর্থবছরে ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। এদিকে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতি সুদহার কমানোর সুফল সামনের দিনগুলোতে পাওয়া যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, ধাপে ধাপে নীতি সুদহার আরও কমে আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হলে সুদ কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা সহজ করতে হবে। ইতিমধ্যে ব্যবসা সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী। আমরা সেগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’
মূল্যস্ফীতি ভোগাচ্ছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। আর ওই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংকোচন মুদ্রানীতি, সুদের হার বাড়ানো, কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে হয় সাড়ে ৮ শতাংশে নেমে আসে। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর রয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। তার কারণে গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। মে মাসের শেষ সপ্তাহে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমার বদলে বেড়েছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ৬০ শতাংশ পরিবারকে তাদের আয়ের অর্ধেক খাবার কিনতে ব্যয় করতে হয়। এই প্রভাব নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর আরও বেশি।
জানতে চাইলে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নীতি সুদহার কমানোর কারণে মূল্যস্ফীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না। কারণ, মূল্যস্ফীতির বড় কারণ বাজার ব্যবস্থাপনা। উল্টো কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ঋণের সুদহার বেড়ে গিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে। তাই নীতি সুদহার আরেকটু কমানো যায় কি না, সেটি দেখতে হবে।
ঝুঁকি কোথায়
অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, সুদ বেশি হলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমে, বাজারে অর্থের প্রবাহও কমে যায়। এতে চাহিদা কমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু নীতি সুদহার কমানোর কারণে উল্টো ঘটনা ঘটতে পারে। তার মানে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত এমন একটি বার্তা দিতে পারে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনের মৌলিক কারণগুলোর খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। যদি খাদ্য সরবরাহের দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং বাজারের বিকৃতি বহাল থাকে, তাহলে কম সুদহার কেবল চাহিদা বাড়াবে। তার বিপরীতে সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও জোরালো হতে পারে।
সেলিম রায়হান আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে শক্তিশালী বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। আর বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসার ব্যয় কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা, অবকাঠামো ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।