কনটেইনার জাহাজ
কনটেইনার জাহাজ

শিপিং কোম্পানির সারচার্জ আরোপ

মধ্যপ্রাচ্যগামী আটকা পণ্যেও খরচ বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে শিপিং কোম্পানিগুলোর খরচ বাড়তে শুরু করেছে। এ বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নিতে কনটেইনার পরিবহনে নতুন করে সারচার্জ আরোপ করেছে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো। যার প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি পণ্য পরিবহনেও।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত সোমবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরানি বাহিনী। এর পরপরই উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে পণ্য পরিবহনের বুক নেওয়া বন্ধ করে দেয় বেশির ভাগ শিপিং কোম্পানি। তবে বুকিং বন্ধ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যগামী যেসব কনটেইনার বন্দরে ও জাহাজে আটকে আছে, সেগুলোর ওপরও এই সারচার্জ গুনতে হবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।

শিপিং কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নোটিশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিভেদে প্রতি একক কনটেইনারে সর্বনিম্ন ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। হিমায়িত বড় কনটেইনারে এই মাশুল চার হাজার ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে কোম্পানিগুলো। প্রতি একক কনটেইনারে সাধারণত ১৪ টন ও বড় কনটেইনারে ২৮ টন বা তার বেশি পণ্য পরিবহন করা যায়।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) হেড অব অপারেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস আজমীর হোসেন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার পরিবহনে বাংলাদেশসহ সব দেশের চালানের ওপরই এই সারচার্জ আরোপ করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো। জাহাজে থাকা কিংবা ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে।

আজমীর হোসেন আরও বলেন, সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। আবার নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ–আমেরিকায় জাহাজ চলাচল বাড়ছে। এতে সামনে পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বাড়তে পারে।

কোন কোম্পানির কত সারচার্জ

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চারটি বড় শিপিং কোম্পানি। এগুলো হলো ডেনমার্কের মায়ের্সক লাইন, সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি, ফ্রান্সের সিএমএ–সিজিএম ও জার্মানির হ্যাপাগ–লয়েড। বাংলাদেশে কনটেইনারবাহী জাহাজ থাকলেও নিজস্ব কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি নেই।

বিদেশি চার কোম্পানির মধ্যে ফ্রান্সভিত্তিক সিএমএ–সিজিএম ৩ মার্চ তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দেয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩ দেশে পণ্য পরিবহনে ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে, যা ২ মার্চ থেকে কার্যকর। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি একক কনটেইনারে সারচার্জ আরোপ করেছে দুই হাজার ডলার।

সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। আবার নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ–আমেরিকায় জাহাজ চলাচল বাড়ছে। এতে সামনে পরিবহন খরচ আরও বাড়তে পারে।
—সাবেক পরিচালক, শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

এ ছাড়া মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কনটেইনারে ৮০০ ডলার বাধ্যতামূলক সারচার্জ আরোপ করেছে। মায়ের্সক লাইন উপসাগরীয় সাতটি দেশে প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে। আর হ্যাপাগ–লয়েড প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৫০০ ডলার যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে, যা ২ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে।

শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, সমুদ্রে আটকে থাকা আরব উপসাগরমুখী জাহাজগুলো কাছাকাছি নিরাপদ বন্দরে খালাস করা হবে। এতে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা মেটাতেই এ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারেও এ বাড়তি ভাড়া প্রযোজ্য হবে।

কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানিতে চাপ

হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য আনা–নেওয়া হয়। লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের কিছু অঞ্চলে পণ্য পরিবহন সম্ভব হলেও অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প পথ নেই।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সাত দেশ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজ হলেও অন্যান্য অনেক পণ্য কনটেইনারে পরিবহন করা হয়। আবার রপ্তানির প্রায় সব পণ্যই যায় কনটেইনারে।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা রপ্তানি হয়। অন্যদিকে প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয় কনটেইনারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এখন আমদানি–রপ্তানি পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। নতুন করে সারচার্জের কারণে চাপ আরও বাড়বে।

অনিশ্চয়তা বাড়ছে

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি এলাকায় ছয়টি তেলবাহী জাহাজ ও একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে এই অঞ্চলে নৌপরিবহন ঝুঁকি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকট দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতি সামাল দিতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করা জরুরি।